বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে সুকুমার রায়ের নাম এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ‘গল্পসমগ্র’ কেবল শিশু-কিশোরদের জন্য রচিত গল্পের সংকলন নয়; এটি কল্পনা, রসবোধ, ব্যঙ্গ, বুদ্ধিদীপ্ততা এবং ভাষার অভিনব ব্যবহারের এক অসাধারণ ভাণ্ডার। এই গ্রন্থে সংকলিত গল্পগুলো পাঠককে যেমন হাসায়, তেমনি চিন্তা করতেও শেখায়।
গ্রন্থটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর বৈচিত্র্য। এখানে স্থান পেয়েছে ‘হযবরল’, ‘পাগলা দাশু’-সহ বহু কালজয়ী গল্প, যেখানে বাস্তব ও কল্পনার এক অভিনব মেলবন্ধন দেখা যায়। অদ্ভুত সব চরিত্র, অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলা ঘটনাপ্রবাহ এবং ননসেন্স সাহিত্যের অনন্য শৈলী সুকুমার রায়ের লেখাকে বাংলা সাহিত্যে স্বতন্ত্র মর্যাদা দিয়েছে।
সুকুমার রায়ের ভাষা সহজ, সাবলীল এবং প্রাণবন্ত। শব্দের অভিনব ব্যবহার, সূক্ষ্ম ব্যঙ্গ এবং হাস্যরসের মাধ্যমে তিনি সমাজের নানা অসংগতি ও মানুষের স্বভাবকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। ফলে গল্পগুলো শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং পাঠকের চিন্তাশক্তি, কল্পনাশক্তি ও ভাষাবোধ বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
‘গল্পসমগ্র’-এর গল্পগুলো সময়ের সীমা অতিক্রম করেছে। প্রকাশের বহু বছর পরও এগুলোর আবেদন এতটুকু কমেনি। ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও সমান আনন্দ নিয়ে এই গল্পগুলো পড়তে পারেন। প্রতিটি গল্পে লুকিয়ে আছে নির্মল হাসি, সৃজনশীল চিন্তা এবং মানবিক মূল্যবোধের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত।
সব মিলিয়ে, ‘গল্পসমগ্র’ বাংলা সাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। যারা সুকুমার রায়ের সাহিত্যজগৎকে জানতে চান কিংবা বাংলা শিশুসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর স্বাদ নিতে চান, তাদের জন্য এই গ্রন্থ একটি অবশ্যপাঠ্য বই। এটি শুধু আনন্দের নয়, কল্পনা ও সৃজনশীলতার এক চিরসবুজ উৎস।
উপেন্দ্ৰকিশোর রায়ের জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ সুকুমারের জন্ম ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে। ১৯০৬-এ পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন দুই বিষয়েই অনার্স নিয়ে বি.এসসি পাশ করার পর ১৯১১-য় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুরুপ্ৰসন্ন ঘোষ বৃত্তি লাভ করে মুদ্রণ বিষয়ে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তিনি বিলেতে যান। লন্ডনে ও ম্যাঞ্চেস্টারে অধ্যয়ন করেন তিনি ও তাঁর গবেষণার জন্য সম্মানিত হন। ১৯১৩-য় উপেন্দ্ৰকিশোরের সম্পাদনায় ছোটদের সচিত্ৰ মাসিক পত্রিকা সন্দেশ’’ প্রকাশিত হয়। সুকুমার দেশে ফেরারী কিছুকাল পরে ১৯১৫-য় উপেন্দ্রকিশোরের মৃত্যু হয়। সুকুমার ইউ রায় অ্যান্ড সন্স কার্যালয়ের পরিচালনার এবং “সন্দেশ’ সম্পাদনার দায়িত্ব গ্ৰহণ করেন। “সন্দেশ’-এর পাতাতেই তাঁর অধিকাংশ ছোটদের লেখা-গল্প, কবিতা, প্ৰবন্ধ, ধাঁধা ইত্যাদি প্রকাশিত হয়েছে। শুধু নিজের লেখা নয়, ছবি এঁকেছেন তিনি। “হ য ব র ল’, ‘আবোল তাবোল’ জাতীয় আজগুবি চালের বেঠিক বেতাল ভুলের ভবের গদ্য ও পদ্য রচনা ছাড়াও শিল্প সাহিত্য ভাষা ধর্ম বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি বিষয়ক গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও সক্রিয় ছিল তাঁর লেখনী। আড়াই বছর কালাজ্বরে ভুগে ১৯২৩-এ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে সুকুমার রায় ১০০ গড়পার রোডের বাড়িতে পরলোকগমন করেন। মৃত্যুর কিছুদিন আগেও তিনি শুয়ে শুয়ে সন্দেশের জন্য ছবি এঁকেছেন, প্রচ্ছদ রচনা করেছেন, গল্প কবিতা লিখেছেন। আবোল তাবোল’-এর ডামি কপিাটাও রোগশয্যায় তৈরি করেছেন। কিন্তু বইটি ছেপে বেরোবার ন” দিন আগে তাঁর মৃত্যু হয়।