লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০) বাঙালি জাতিসত্তা ও দর্শনের এক অবিচ্ছেদ্য নাম। তিনি বিশ্বে বাঙালির দর্শন দারিদ্র ঘুচিয়েছেন। ১৮৭২ সাল থেকে সুধীজনে লালনচর্চার ইতিহাস শুরু হয়। সে হিসেবে সুধীসমাজে লালনচর্চার বয়স প্রায় দেড়শ’ বছর। এই বিশাল সময়-পরিক্রমায় লালন ফকিরের দর্শন, জীবন এবং তাঁর গান সংগ্রহ, সংরক্ষণের চেষ্টা চলেছে, চলছে। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সংগ্রাহক প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তি উদ্যোগে লালন ফকিরের গান সংগ্রহ করেছেন, প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সমস্যা যেটি দেখা দিয়েছে তাহলো নির্বিচারী সংগ্রহ পদ্ধতি এবং ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্বÑ যার ফলে একই গানের ভিন্নপাঠ, ভিন্নভাষ্য এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রক্ষিপ্ত গান যা লালন ফকিরের রচনা নয় মর্মে গবেষকগণের অনুমানÑ তা লালন ফকিরকে করে তুলেছে খণ্ডিত ও বিতর্কিত। এর ফলে লালন ফকিরের গানের সংখ্যা, শুদ্ধপাঠ ও গানের অর্থ নিয়ে সাধারণ পাঠক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। সেই তাগিদ থেকে ‘লালনগীতিসমগ্র: প্রামাণ্য সংকলন’ প্রকাশের প্রয়াস।
‘লালনগীতিসমগ্র: প্রামাণ্য সংকলন’ মূলত লালন ফকিরের নির্ভেজাল গানের সংকলন। এই সংকলনে আমরা লালন ফকিরের প্রামাণ্য গানকে স্থান দিয়েছি। প্রামাণ্য বলতে লালন ফকিরের যে সকল গান দালিলিকভাবে পরীক্ষিত সেসকল গানকেই আমরা এই সংকলনে সন্নিবেশিত করেছি। আমরা জানি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লালন ফকিরের আখড়া থেকে মনিরুদ্দিন শাহ কর্তৃক লিপিকৃত দু’টি গানের খাতা নিয়ে গিয়ে আর ফেরত দেননি, যা কলকাতার রবীন্দ্র সদনে রক্ষিত আছে এবং বিশিষ্ট গবেষক শক্তিনাথ ঝাঁ ভোলাই শাহ’র খাতা নামে একটি খাতা সংগ্রহ করেনÑ যা বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে রক্ষিত রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক সংগ্রহকৃত দু’টি খাতার ফেক্সিমেলি এডিশন প্রকাশিত হয়েছে; কিন্তু তার পাঠোদ্ধার অত্যন্ত কঠিন। শক্তিনাথ ঝাঁ ভোলাই শাহ’র খাতার গান প্রকাশ করেন। এছাড়াও ১৮৯০ সালে পাক্ষিক হিতকরীতে প্রকাশিত গান, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার কর্তৃক তাঁর ব্রহ্মাণ্ডবেদ এ প্রকাশিত গান, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সরলাদেবী কর্তৃক সংগ্রহকৃত ও প্রকাশিত গানকে প্রামাণ্য ধরে বর্তমান সংকলন সাজানো হয়েছে। তবে অন্যান্য সংগ্রাহকের সংগ্রহ হতে পরীক্ষিত গানও স্থান পেয়েছে এ সংকলনে।