প্রথমেই বলে রাখছি, এটি কোনও প্রচলিত গ্রন্থ নয়। এ-গ্রন্থে জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলাপচারিতায় প্রকাশিত অভিমত এবং বয়ান উপস্থাপন করেছেন সরদার ফজলুল করিম। এর সূত্রধরও তিনি। বস্তুত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস ও তৎকালীন সামাজিক চালচিত্র জানাবোঝার ক্ষেেত্র এ-দুই জ্ঞানসন্ধানী ব্যক্তরি কথালাপ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ-প্রতিবেদনের উপস্থাপক সরদার ফজলুল করিম [১৯২৫Ñ২০১৪]-এর জন্ম বরিশাল জেলার উজিরপুরের আটিপাড়া গ্রামে, এক কৃষক পরিবারে। তিনি ছিলেন একাধারে শিক্ষক, দার্শনিক, সমাজবিশ্লষেক ও মুক্তসিংগ্রামী। তিনি সমকালের সাক্ষী হয়ে আছেন কর্ম ও লেখার মাধ্যমে। বিশেষত রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য হিসেবে তাঁর কথা ও লেখা উত্থাপন করা যায় এবং অনেকেই ব্যবহার করে থাকেন। তিনি মেহনতি শ্রমিক, কৃষক সমাজের মুক্তরি স্বপ্ন,ে সংগ্রামে নিয়োজিত ছিলেন সারাজীবন। সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মহলেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠতি করেছেন।ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষক হয়েছেন। ওই সময় শিক্ষাগুরু হিসেবে পেয়েছেন কিংবদন্তি আবদুর রাজ্জাক(১৯১২-১৯৯৯)-কে। উল্লখেযোগ্য যে, সরদার ফজলুল করিম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৫ সালে স্নাতক ও ১৯৪৬ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। রাজনীতি, সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন তিনি। যে কারণে তাঁর প্রতিটি লেখা, দিনলিপি, কথা, ভাষণ আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিকতার বাইরে তাঁর এক সাধারণ পরিচিতি রয়েছেÑদার্শনিক। বহুবর্ণিল ও কর্মময় তাঁর জীবন। যে জীবন ছিল সাধারণ মানুষের জন্য নিবেদিত। ফলেতাঁর কোনও বিচ্যুতি লক্ষ করি না। যে রাজনীতির জন্য দলীয় সিদ্ধান্তে ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার চাকরি ত্যাগকরেন। তাঁর কথায়Ñ ‘আমি যেমন সহজে শিক্ষক হয়েছিলাম তেমনি সহজে শিক্ষকতার কাজ ছেড়েও দিয়েছিলাম’। সে সময় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে ছিলেন। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই তাঁকে দলের কাজ করতে হয়েছে। ১৯৪৯ সালে ঢাকা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক নির্বাচিত হন। স্মরণীয় ১৯৫৪ সালে কারাগারে থেকেই কনস্টিিটউশনাল অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর নির্বাচিত হওয়ার সংবাদ মার্কিন দেশের কাগজে গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হয়। ১৯৭১ সালে মুক্তযিুদ্ধ শুরু হলে আবারও পাকিস্তান সরকার তাঁকে গ্রফেতার করে। মুক্ত হন স্বাধীনতা লাভের পর। তাঁর জীবনের প্রায় ১১ বছর গেল কারাগারে। ১৯৭২ সালে পুনরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হন।
সরদার ফজলুল করিম প-িত-শিক্ষক।তাঁর সমকালে আরও অনেক মেধাবী শিক্ষক ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে। ওই সব মেধাবী, জ্ঞানী শিক্ষকদের আবার শিক্ষক ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। আবার দু-জনই জাতীয় অধ্যাপকের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন। উল্লখেযোগ্য যে, সরদার ফজলুল করিম শুধু শিক্ষক ছিলেন না, অনেক চিরায়ত গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন এবং লিখেছেন মৌলিক বই। তাঁর অনুবাদসহ রচনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো : প্লেেটার রিপাবলিক; প্লেেটার সংলাপ; অ্যারিস্টটলের পলিটিক্স; এঙ্গলেসের এ্যান্ট-িডুরিং; রুশোর সোশ্যাল কন্টাক্ট; দ্য কনফেশানস; দর্শনকোষ; সেই সে কাল : কিছু স্মৃতি কিছু কথা; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা; চল্লেিশর দশকের ঢাকা; নানা কথা; নানা কথার পরের কথা; নূহের কিশতী ও অন্যান্য প্রবন্ধ; রুমীর আম্মা ও অন্যান্য প্রবন্ধ; গল্পরে গল্প; পাঠ প্রসঙ্গ; আরেক যুগে যুগোশ্লাভিয়ায়; সেইসব দার্শনিক; আমি মানুষ; আমি সরদার বলছি; স্মৃতি সমগ্র, আমার প্রয়ি মুখ, আমার জানালা, আত্মজীবনী ও অন্যান্য, আমার পৃথিবী; শ্রষ্ঠে প্রবন্ধ ইত্যাদি। এ জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কারলাভ করেন। এগুলো হলো : সিধুভাই স্মৃতি পদক ১৯৯৮, গুণমুগ্ধজন পুরস্কার ১৯৯৯, দৈনিক জনকণ্ঠ গুণীজন সম্মাননা ১৯৯৯, স্বাধীনতা পুরস্কার ২০০০, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ গুণীজন সম্মাননা ২০০১, দেওয়ান গোলাম মোর্তজা স্মৃতিপদক ২০০৫, সা’দত আলি আখন্দ সাহিত্য পুরস্কার ২০০৮, বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
বস্তুত ‘ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ : অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা’ অনন্য গ্রন্থ। যে কারণে শুরুতেই বলা হয়েছে এটি কোনও প্রথাগত গ্রন্থ নয়।স্মরণীয় ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও বাংলাদেশের ইতিহাস পরস্পরক। ফলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাসের পর্যবেক্ষণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। ‘এটি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সম্পর্কে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত স্মৃতিকথা’ অন্যদিকে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তত্ব।ি বিভিন্ন কারণে তিনি রহস্যময় ও মিথিক ব্যক্তেিত পরিণত হন। আবার আবদুর রাজ্জাকের রচনা নেই বললেই চলে। তাঁর ইধহমষধফবংয: ঝঃধঃব ড়ভ ঃযব ঘধঃরড়হ (১৯৮১) এবং বহুদিন পর প্রকাশিত চড়ষরঃরপধষ চধৎঃরবং রহ ওহফরধ (২০২২) ছাড়া আর কোনও মুদ্রতি লেখা এখনও পাওয়া যায়নি।তবে তাঁকে স্মরণ ও শ্রদ্ধায় কিছু লেখাএবং সম্পাদিত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলোই এখন আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে জানার অবলম্বন। যেমন,আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে কথোপকথনের আলোকে আহমদ ছফা লিখেছেন যদ্যপি আমার গুরু (১৯৯৮)। রয়েছে হুমায়ুন আজাদের সাক্ষাৎকার (২০১২) ও জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাক স্মারকগ্রন্থ (২০১৫)। হুমায়ুন আজাদচারজন মনীষীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে আবদুর রাজ্জাক একজন। এ গ্রন্থরে ভূমিকাংশে চারজন সম্পর্কে আলাদা ধারণা উপস্থাপন করেছেন হুমায়ুন আজাদ। তিনি আবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে বলেছেন, ‘জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক আমাদের এই সময়ের সে-অনন্য পুরুষ, যাঁকে ঘিরে কয়েকদশক ধরে জড়ো হয়েছে নানা রহস্য; পরিণত হয়েছেন যিনি জীবিত উপকথা বা কিংবদন্তেিত। ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর বহুমুখি পা-িত্যরে নানা গল্প, জীবনের অসংখ্য উপাখ্যান। শারীরিক সৌন্দর্যে দেবতুল্য নন তিনি যে তাঁকে দেখেই দর্শক ভক্ত হয়ে উঠবে; বাগ্মীও নন তিনি যে শ্রােতা তাঁর বাণী আস্বাদ করে স্পর্শ পাবে অমৃতের। মোটা মোটা বই লিখেন নি অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক, অলংকৃত করেন নি জ্যােতির্ময় বিভিন্ন আসন; এমনকি নিজের নামের সঙ্গে তিন অক্ষরের একটি উপাধিও যুক্ত করেন নি তিনি। তবু তিনিই হয়ে উঠেছেন আমাদের সাম্প্রতিক জ্ঞানজগতের কিংবদন্ত।ি এর মূলে আছে সম্ভবত দুটি সহজ কিন্তু অসাধারণ কারণ : প্রাচীন ঋষিদের মতোই তিনি নিজের দীর্ঘ ও সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন জ্ঞান আহরণে এবং ঋষিদের মতোই তিনি অবলীলায় অবহেলা করে গেছেন পার্থিব সাফল্য। জ্ঞানের জন্যে এমন তপস্যা-জীবন সংসার, সাফল্যরে কথা ভুলে- এখন দুর্লভ ব্যাপার; আর তাই রূপ লাভ করতে দেখি জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের মধ্য।ে শুধুই জ্ঞানের জন্যে সব ত্যাগ করে তিনি হয়ে উঠেছেন এই সময়ের জ্ঞানতাপস’।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও আবদুর রাজ্জাকের জ্ঞানসাধনার কারণেই এ আলাপ জরুরি ছিল। আবদুর রাজ্জাক ছিলেন মানবতাবাদী, আলোকিত মানুষ। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষকতার সময় এমন কোনও সচেতন শিক্ষক ছিলেন না, যিনি তাঁর দ্বারা প্রভাবিত হননি। জ্ঞানের প্রতি আগ্রহ রয়েছে অথচ তাঁর সঙ্গে কথা বলেননি, এমন কেউ ছিলেন না। আবদুর রাজ্জাক আড্ডা, দাবা খেলা, গল্প ইত্যাদি পছন্দ করতেন। তিনি সাধারণত বক্তৃতা দিতেন না বা দিতে পছন্দ করতেন না। তবে যে কোনও জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থী, শিক্ষককে বই পড়া, চিন্তাভাবনার পথ বাতলে দিতেন। কে কী বিষয়ে গবেষণা করবেন বা করা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে দিতেন। আনিসুজ্জামান তাঁর সম্পর্কে বলেছেন,Ñ ‘বিশ^কোষতুল্য’ ব্যক্ত।ি ওই সময়ে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে একদল জ্ঞানসন্ধানী তৈরি করতে তিনি সফল হয়েছেন। যাঁরা শুধু বিশ^বিদ্যালয় নয়, সমাজের বিভিন্ন ক্ষেেত্র অবদান রেখেছেন। সলিমুল্লাহ খান বলেছেন, ‘ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আর আবদুররাজ্জাক প্রায় সমার্থক শব্দ। ...মাস্টার হিসাবে আবদুর রাজ্জাক সক্রাতেসের মতো ছিলেন বললে কোনো কিছু বাড়িয়ে বলা হয় না’। নিজের ক্যারিয়ার উন্নয়নে কিছুই ভাবতেন না, তবে অন্যদের তিনি উচ্চশিক্ষায় উদ্দীপ্ত করতেন। কথা বলতে বলতে অনেকের জীবনকে তিনি বদলে দিয়েছেন। উপাচার্য জেনকিনসের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন আমাদের বিবেচনা করতে হয়। যেক্ষেেত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে আবদুর রাজ্জাকের ব্যক্তত্ব।ি
সরদার ফজলুল করিম ভেবেছেন, মানুষের মৃত্যু হলেই তা অতীত হয়ে ওঠে। তখন লেখা হয় জীবনী। কেবল গত হলেই যে লেখা হবে জীবনী বা ইতিহাস; সকল সময় এ বক্তব্য তেমন তাৎপর্য বহন করে না। ‘একটি জীবন্ত জাতি বা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘ এবং গতিময় জীবনে পর্যায় থেকে পর্যায়ন্তর সৃষ্টি হয়। একটি স্তর থেকে উন্নততর স্তরে অগ্রসর হওয়ার জন্যই মানুষেরআবশ্যক হয় বিগত পর্যায়ের জীবনকে জ্ঞাত হওয়ার। সে কারণেই জীবন্ত জাতিরও ইতিহাস হয় এবং সে ইতিহাস জানার আমরা প্রয়োজন বোধ করি। এই কথা গতিময় জীবন প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সম্পর্কেও সত্য’। আবদুর রাজ্জাকের কর্মক্ষত্রে ছিল ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়। স্বভাবতই এটা ছিল তাঁর চিন্তার প্রাণকেন্দ্র। মনসুর মুসার তথ্যে ‘১৯৩৮ সালের অক্টােবর মাসের ৩১তারিখ আব্দুর রাজ্জাক ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স বিভাগে অস্থায়ী প্রভাষক(ক্লাস-টু) পদে যোগদান করেন। এই পদের প্রভাষক নিয়োগের জন্য কমিটি করা হয়েছিল ১ মে ১৯৪৬ সালে’।এখানে লক্ষণীয় বিশ^বিদ্যালয় বিকাশের ইতিহাস এবং তাঁর ব্যক্তি ও শিক্ষক জীবনের অভিযাত্রা প্রায় একই। সংগত কারণেআবদুর রাজ্জাক সম্পর্কে সরদারও বলেছেনÑ ‘চলমান বিশ^কোষ’। তিনি মনে করেছেন, তাঁর কাছ থেকেই অনেক তথ্য জেনে নেওয়া সম্ভব। ফলত এ আলোচনায় রাজনীতি, সমাজের বিবিধ বিবেচনা, সাংস্কৃতিক ইতিহাস ওঠে এসেছে।একইসঙ্গে আছে কতক প্রশ্নরে মীমাংসা।
তাঁরা কথা বলেছেন, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় কার কী অবদান। লেখাপড়ার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক, সম্প্রীতির বিভিন্ন উদাহরণ, ফল নির্ধারণ পদ্ধতি বাফল তৈরিতে জালিয়াতি হয় কি না? বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে ব্যক্তি সম্পর্ক, রাষ্ট্র, সরকার ও বিশ^বিদ্যালয়ের সম্পর্কের বিভিন্ন মাত্রা ইত্যাদি বিষয়ে।প্রসঙ্গত বঙ্গভঙ্গ, দেশবিভাগ, দাঙ্গা, শিক্ষাব্যবস্থা, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস আবশ্যকিভাবে এসেছে। এ ছাড়াও রয়েছে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা ও উপনিবেশের চরিত্র এবং ভাষা আন্দােলন প্রসঙ্গ। একইভাবে উপনিবেশের বিরোধিতা এবং একাত্তর সালের মহান মুক্তযিুদ্ধ; স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এ সংলাপ। এসব গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে এ-দেশে জাতীয়তাবাদী আন্দােলন গড়ে ওঠে এবং প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা বিকশিত হয়। তাঁরা আলোচনা করেছেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নিয়ে। যেমন আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, ‘যে শ্রণেী থেকে হিন্দু শিক্ষক হতো, সে ক্লাসের ছাত্র তো মুসলমান নয়। তবে মুসলমান ছেলে ভালো করলে হিন্দু শিক্ষক অবশ্যই খুশি হতেন।... তার কৃতিত্ব তাঁরা স্বীকার করতেন। হরিদাস বাবু, মানে হরিদাস ভট্টাচার্য, দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন। তার কম্যুনাল বলে পরিচয় ছিল। টিকিধারী ব্রাহ্ম। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেেত্র, ছাত্রদের বিদ্যার বিচারে কখনো তিনি কম্যুনাল হননি’।এখনও মাঝে মাঝে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নিয়ে কিছু অমূলক, অপ্রাসঙ্গকি কথা শোনা যায়। কতক বিষয়ে কিছু বিভ্রান্তওি তৈরি হয়েছে। এসব বিভ্রান্তি অপনোদনের জন্য এ-আলাপচারিতা অত্যন্ত প্রাসঙ্গকি এবং অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এক প্রশ্নরে প্রিেক্ষতে আবদুর রাজ্জাক বলেছেন,‘ন্যাসেন্ট মিড্ল ক্লাসের একটা অংশ আহসান মঞ্জেিলর সাথে একটা সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করেছিলো। কিন্তু ইট নেভার ওয়াজ এ ওয়ার্কিং রিলেশন। ঢাকায় ইউনিভার্সিটি যখন তৈরি হয়েছে তখন নওয়াব পরিবার ক্ষয়ের চরমে পৌঁছে গেছে।... ইউনিভার্সিটির কোনো প্রতিষ্ঠানে ঢাকার নওয়াব পরিবারের কোনো দান ছিলো না’। মূলত, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাজাত অনেক সমস্যা, শাসন, ঔপনিবেশিক অবশেষ, জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সন্ধৎিসু-জিজ্ঞাসার উত্তর রয়েছে এ আলাপচারিতায়।
আমরা যে বিষয়ে বলি না কেন,কথা বলার সমস্যা সব সময়ই ছিল। কথোপকথনের অনেক শব্দ আমরা অনুভব বা উপলব্ধি করতে পারি না। কারণ ভাষা বিনিময়ের কোনও সমস্যা না হলেও ব্যঞ্জনার মাত্রা অনেকেই বুঝে না। আবদুররাজ্জাক বলেছেন, উচ্চারণজাত অর্থ সময়ের ব্যবধানে অবিকল থাকে না। বস্তুত শুধু ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ইতিহাস নয়, বিবিধ বিবেচনায় এ বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিশ্চতি, পাঠকের আকাক্সক্ষা পূরণে এ-বইটি সহায়ক হবে।