একশ বছর পর — ১০ ডিসেম্বর, ১৯৮৫ (ভোর ৫ টা) বার্লিন, জার্মানি
ভোরের কুয়াশা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। শহরের মানচিত্রের কোণে চাপা পড়ে যাওয়া, সময়ের স্মৃতিতে প্রায় বিলীন এক নাম সিমেন্সবান। বার্লিনের এক পুরনো স্টেশন। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সময়ের ধুলো গায়ে মেখে। মরচে ধরা রেললাইনের ফাঁকে ফাঁকে গজিয়ে ওঠা ঘাস তুষারে ঢেকে বাদামী বর্ণ ধারণ করেছে, ভাঙা প্ল্যাটফর্মের প্রান্তে খসে পড়া কংক্রিটের টুকরো পড়ে আছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, ঝরে পড়া ছাদের নিচে জমে আছে শতাব্দীর স্তব্ধতা।
বহু বছর এখানে কোনো ট্রেন থামে না। মানুষের পায়ের শব্দও পৌঁছায় না।
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা ভেঙে বাতাস কেঁপে উঠল। দূরে কোথাও ধাতব চাকার শব্দ প্রথমে খুব ক্ষীণ, তারপর ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল। মরচে ধরা লোহার ভেতর দিয়ে শব্দটা ছড়িয়ে পড়তেই রেললাইন হালকা কেঁপে উঠল। কুয়াশার আড়াল থেকে ভেসে এলো এক পরিচিত ছন্দ। হঠাৎই বাতাসে বেজে উঠল ট্রেনের সিটি। যে সিটি এই স্টেশন শোনেনি বহুকাল।
কুয়াশার বুক চিরে ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল এক অদ্ভুত ট্রেন। পুরোনো সাইনবোর্ডটি হালকা দুলে উঠল হাওয়ার টানে।
ঝকঝকে সোনালী রঙের দেহ। স্পাতের গায়ে শিশির জমে মুক্তোর মতো ঝিলমিল করছে, জানালার কাঁচ বেয়ে ফোঁটাগুলো নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ছে নিচে। কাঁচের ওপারে আলো জ্বলছে মৃদু উষ্ণতায়। শিশিরে ঝাপসা হয়ে যাওয়া জানালার আড়ালে আবছা ছায়া নড়েচড়ে উঠছে বারবার।
মানুষজন ছুটে এল চারদিক থেকে। ভিড় জমতে শুরু করছে। কেউ দৌড়ে আসছে, কেউ থেমে দাঁড়িয়ে রইল অবিশ্বাসে। কেউই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না।
পরিত্যক্ত স্টেশনে ট্রেন! তাও আবার সাধারণ কোনো ট্রেন নয়, উনিশ শতকের ছবিতে দেখা সেই ভিক্টোরিয়ান যুগের স্টিম ট্রেন।
লম্বা, ভারী স্পাতের বডি, গোল মাথার ইঞ্জিন, বগিগুলোর গায়ে খোদাই করা নকশাগুলো আলো পড়তেই মৃদু ঝিলিক তুলে দিচ্ছে। পিতলের হাতল আর ফ্রেমগুলো এতটাই পালিশ করা, তাতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখগুলো ভেসে উঠছে ভেঙে ভেঙে।
সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় কোথাও ধুলো নেই, মরচে নেই। পরিত্যক্ত স্টেশনের মৃত বাতাস ট্রেনটিকে স্পর্শ করার সাহসই পায়নি। স্পাতের গায়ে সময়ের কোনো আঁচড় নেই, নেই ব্যবহারের ক্লান্তি। বরং পুরো ট্রেনটি ঝকঝকে, নিখুঁত, প্রায় অস্বাভাবিক রকমের জীবন্ত যেন এইমাত্র কোনো কারখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে।
ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ একটা চাপা কণ্ঠ ভেসে এল।
“এটা কি কোনো সিনেমার শুটিং?” একজন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।
পাশের লোকটা ধীরে মাথা নাড়ল। চোখ সরাল না ট্রেনের দিক থেকে।
নিচু স্বরে বলল,
“না.. শুটিং হলে এত নিখুঁত হতো না। আর এখানে তো কোনো ক্যামেরা নেই।”
কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন অস্বস্তিতে চারদিকে তাকাল। সত্যিই তো না আলো, না তার, না কোনো নির্দেশক। শুধু ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে, নির্বিকার।
ভিড়ের ভেতর হঠাৎ একজন বৃদ্ধ থেমে গেল।
তার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল, সে সামনে তাকিয়ে বলল,
“আরে এমন ট্রেন তো আমি ছোটবেলায় দেখেছি।”
ট্রেনের সামনে খোদাই করা অক্ষরগুলো পড়তে পড়তে এক যুবক ফিসফিস করে বলল,
“এটা ইতালিয়ান?”
কাঁধে জড়ানো শালটা সামান্য গুছিয়ে এক যুবতী কাছে এগিয়ে এলো।
ঠোঁট নেড়ে নেড়ে অচেনা ভাষার শব্দগুলো স্পষ্ট করে উচ্চারণ করল,
“লা মিরাকলো দি তেম্পো—১৮৮৫।”
ট্রেনটি তখনো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে। ইঞ্জিনের চিমনিটা নিঃশব্দে কাঁপছে কিন্তু ধোঁয়া উড়ছে না, কোনো বাষ্পও ছুটে বের হচ্ছে না। তবু তার ভারী ধাতব দেহের গভীরে উষ্ণতার এক ক্ষীণ স্পন্দন এখনো বেঁচে আছে। মনে হয়, এইমাত্রই সে বহু দূর, বহু পথ পেরিয়ে এখানে এসে থেমেছে।