পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব পর্যন্ত পাঁচশো বছর ধরে উপমহাদেশে একটি নীরব যুদ্ধ চলেছিল। যুদ্ধটা রণাঙ্গনে নয়; সংঘটিত হয়েছে মসজিদের মিম্বরে, বিতর্কের মজলিসে, গ্রামেগঞ্জে, হাটবাজারে, অলিগলিতে। এই যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল ইউরোপীয় খ্রিষ্টান মিশনারি, তাদের সঙ্গে ছিল রাষ্ট্রশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা; অন্য পক্ষে ছিলেন সহায়-সম্বলহীন উলামায়ে কেরাম, তাদের সঙ্গে ছিল কেবল ইলম ও ঈমানের পুঁজি।
মাওলানা ইমদাদ সাবেরি রচিত ‘উপমহাদেশে মিশনারি আগ্রাসন : উলামায়ে হিন্দের প্রতিরোধের ইতিহাস’ সেই বিস্মৃতপ্রায় যুদ্ধের সবচেয়ে বিস্তারিত ও দলিলনির্ভর বিবরণ।
আমরা বইটিতে দেখতে পাব, মিশনারিরা শুধু ধর্মপ্রচারক ছিলেন না; তারা ছিলেন উপনিবেশবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রদূত। পর্তুগীজ আমলে ভারতবর্ষে আগমন, হিন্দুস্তানিদের মাঝে খ্রিষ্টধর্ম প্রচারের বিচিত্র পন্থা ও পদ্ধতি, মোগল দরবারে ধীরে ধীরে বলয় তৈরি, এরপর আকবর থেকে আওরঙ্গজেব পর্যন্ত শাহি দরবারে মিশনারিদের পদচারণা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ছত্রছায়ায় সংগঠিত ধর্মান্তর অভিযান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও এতিমখানার আড়ালে ভ্রান্ত বিশ্বাসের অনুপ্রবেশ—এই পুরো ইতিহাস লেখক তুলে ধরেছেন প্রামাণ্য সূত্রসহ।
পাশাপাশি উঠে এসেছে প্রতিরোধের সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়, যা ইতিহাসের পাতায় প্রায় অনুপস্থিত। মিশনারি আগ্রাসন প্রতিরোধে উলামায়ে কেরামের সাংগঠনিক কার্যক্রম, শিক্ষা ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান, রচনা ও গবেষণা, ম্যাগাজিন ও পত্রপত্রিকা ইত্যাদির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ তুলে এনেছেন লেখক। হিন্দুস্তানের মাটিতে সংঘটিত সবচে আলোচিত কিছু মুনাজারার ইতিবৃত্ত এবং মিশনারি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জীবনোৎসর্গকারী উলামায়ে কেরামের জীবনীও সবিস্তারে আলোচিত হয়েছে।
বইটি কেবল ইতিহাসের গতানুগতিক বর্ণনা নয়, এটি একটি কাউন্টার ন্যারেটিভ; যা ইউরোপকেন্দ্রিক উপনিবেশের ইতিহাসের বিপরীতে মুসলিম দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ। এটি প্রকাশের পর ভারতবর্ষের বিখ্যাত সব মনীষী—মৌলানা আবুল কালাম আজাদ থেকে মাওলানা কারি তৈয়ব, সবাই এককণ্ঠে বইটিকে অপরিহার্য পাঠ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
আজকের মিশনারি কার্যক্রমের শিকড় এই পাঁচশো বছরের ইতিহাসেই প্রোথিত। সুতরাং অতীতের কৌশল না জানলে বর্তমানের মোকাবিলা সম্ভব নয়। দাঈ, গবেষক, আলেম, তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ছাত্র এবং ইতিহাস-সচেতন প্রতিটি মুসলিম পাঠকের জন্য এই বই অবশ্যপাঠ্য।