মানুষ হিসাবে আমরা ভালোবাসতে পছন্দ করি। আর এই ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় জীবনের বহু জটিলতা। তবুও আমরা ভালোবাসি। কারণ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেছিলেন—
“ভালোবাসা দিয়ে
,ভালোবাসা না পেলে
তার জীবন দুঃখের ও জড়তার।”
হয়তো আমরা দুঃখ পেতেও ভালোবাসি, তাই মানুষকে ভালোবাসি। একবার যাদের প্রতি হৃদয়ে ভালোবাসার জন্ম হয়, তাদের কাছ থেকে অবহেলা বা কষ্ট পেলেও সহজে ভুলে থাকা যায় না। মানুষের এক অদ্ভুত স্বভাব হলো—সত্যিকারের ভালোবাসাগুলোকে অবহেলা করা, আর যেখানে অপমান ও প্রতারণা অপেক্ষা করে, সেখানেই বারবার ফিরে যাওয়া।
প্রেম হোক কিংবা সমাজ—চিত্রটা যেন একই। মানুষ অনেক সময় এমন ব্যক্তিদেরই অনুসরণ করে, যাদের ক্ষমতা ও প্রভাব আছে, কিন্তু সততা নেই। নির্বাচনের সময় জনগণ আশার আলো দেখে ভোট দেয়, অথচ নির্বাচনের পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো হারিয়ে যায় সময়ের ভিড়ে। অন্যদিকে যে মানুষটি নীরবে মানুষের পাশে থাকে, পরামর্শ দেয়, সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করে, সাধারণ জীবনযাপন করে—তাকে প্রায়ই গুরুত্ব দেওয়া হয় না। কারণ আমাদের সমাজ অনেক সময় সরলতাকে দুর্বলতা ভেবে ভুল করে।
এই বইটিতে আমি সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছি। সমাজের বিশৃঙ্খলা, সিস্টেম নামক অদৃশ্য দানব, প্রিয় মানুষের অবহেলা, বেকারত্বের কষ্ট, আন্দোলন, হতাশা ও মানুষের নিঃসঙ্গতা—এসবই এই বইয়ের মূল উপজীব্য। চারপাশে ঘটে যাওয়া অসংখ্য অন্যায়, বিচারহীনতা এবং মানুষের অসহায়ত্ব আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। বিশেষ করে খুন, ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলোর বৃদ্ধি আমাদের সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকেত বহন করে।
আমার আরেকটি বড় পর্যবেক্ষণ ছিল যুবসমাজকে নিয়ে। তাদের অনেকেই আজ হতাশ—কারও চাকরি নেই, কারও প্রিয় মানুষ হারিয়ে গেছে, কেউ ভালোবেসে প্রতারণার শিকার হয়েছে। কেউ একজন মানুষকেই নিজের পৃথিবী ভেবেছে, অথচ সেই মানুষটিই তাকে অপশন হিসেবে দেখেছে। আমি প্রায়ই ভাবি, যারা সত্যিকারের ভালোবাসায় বিশ্বাস করে, তাদেরকেই কেন সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয়?
অনেকে বলেন, এখন আর নব্বইয়ের দশক নেই; শুধু আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। হয়তো কথাটি আংশিক সত্য। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, পৃথিবীতে যেভাবে অবিশ্বাস ও প্রতারণা বাড়ছে, মানুষ একদিন আবার সত্যিকারের অনুভূতির কাছেই ফিরে আসবে। এই যান্ত্রিক জীবনে মানুষ আবার মানুষের কাছে সময় চাইবে, হাতে লেখা চিঠি চাইবে, কবিতা শুনতে চাইবে, নদীর পাড়ে বসে গল্প করতে চাইবে, গ্রামীণ শান্ত পরিবেশে একটু প্রশান্তি খুঁজবে।
তাই কখনও সত্যিকারের ভালোবাসাকে অবহেলা করবেন না। কারণ এই সময়ে নির্মল ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা খুবই বিরল। একবার হারিয়ে গেলে হয়তো তাকে আর ফিরে পাওয়া যায় না। তখন আক্ষেপ আর নিঃসঙ্গতাই হয়ে ওঠে জীবনের দীর্ঘস্থায়ী সঙ্গী।
সবশেষে, পৃথিবীর প্রতিটি সত্যিকারের ভালোবাসার জয় হোক। প্রিয় মানুষগুলোর মুখে আজীবন হাসি লেগে থাকুক। কারণ তাদের ভালো থাকাই আমাদের বেঁচে থাকার অন্যতম কারণ।