বাংলাদেশের ইতিহাসে কিছু সময় আসে, যেগুলো কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম হয়ে থাকে না; বরং সেগুলো হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের আর্তনাদ, ক্ষোভ, স্বপ্ন এবং প্রতিরোধের ভাষা। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন ছিল তেমনই এক সময়। এটি শুধুমাত্র একটি আন্দোলন ছিল নাÑএটি ছিল রাষ্ট্র, সমাজ এবং মানুষের বিবেককে প্রশ্ন করার এক ভয়ংকর মুহূর্ত। সেই উত্তাল সময়ের অসংখ্য অশ্রু, রক্ত, প্রতিবাদ, হারিয়ে যাওয়া মুখ এবং ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের দলিল হয়ে উঠেছে এই বইÑ “জুলাই আন্দোলন এবং গুলিবিদ্ধ দুটি চোখ”।
এই বইয়ের নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে এক গভীর প্রতীক। “গুলিবিদ্ধ দুটি চোখ” কেবল কোনো একজন মানুষের ক্ষত নয়; এটি আসলে একটি জাতির আহত দৃষ্টি। যে চোখ একসময় স্বপ্ন দেখত, যে চোখ ন্যায়বিচার খুঁজত, যে চোখ স্বাধীনতার অর্থ বুঝতে চাইতÑসেই চোখকেই গুলি করা হয়েছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, চোখ অন্ধ করা গেলেও দৃষ্টি কখনও হত্যা করা যায় না। এই বই সেই অমর দৃষ্টির কথাই বলে। বইটির প্রতিটি পৃষ্ঠা পাঠককে নিয়ে যাবে এক ভয়াবহ অথচ বাস্তব সময়ের ভেতরে। এখানে আছে রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণদের কণ্ঠ, আছে আতঙ্কে কেঁপে ওঠা পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস, আছে দূর প্রবাসে বসেও দেশের জন্য ব্যথিত মানুষের নির্ঘুম রাত।
এই বইয়ের একটি বিশেষ শক্তি হলো এর মানবিকতা। এখানে রাজনৈতিক ভাষণের চেয়ে বেশি জায়গা পেয়েছে মানুষের কষ্ট, মমতা, প্রতিবাদ এবং নৈতিক সংকট। আন্দোলনের সময় কে কোন দলে ছিল, কে কোন মতাদর্শে বিশ্বাস করতÑতার চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে একটি প্রশ্ন: মানুষ কি মানুষের পাশে দাঁড়াবে? যখন রাজপথে তরুণদের রক্ত ঝরছিল, তখন কেউ প্রতিবাদ করেছে, কেউ নীরব থেকেছে, আবার কেউ সেই হত্যাকাণ্ডকেই বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এই বই সেই নীরবতারও দলিল। কারণ ইতিহাসে শুধু যারা অন্যায় করে তারাই দায়ী নয়; অনেক সময় যারা অন্যায়ের সামনে চুপ থাকে, তারাও ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়।
বইটিতে পাঠকরা জানতে পারবে কীভাবে একটি আন্দোলন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হৃদয়েও আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেÑমানুষ প্রতিবাদ করেছে, সংগঠিত হয়েছে, তহবিল সংগ্রহ করেছে, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছে। এই অধ্যায়গুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দেশ কেবল ভৌগোলিক সীমারেখা নয়; দেশ আসলে স্মৃতি, মায়া, দায়বদ্ধতা এবং ভালোবাসার নাম।