বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক অনন্য নাম। জন্ম তাঁর অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার মাইজপাড়া গ্রামে, ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। দেশভাগের পর পরিবারসহ কলকাতায় স্থায়ী হলেও তাঁর স্মৃতির গভীরে, সৃজনের অন্তঃসলিলে, এবং আত্মপরিচয়ের বোধে বাংলাদেশ ছিল অবিচ্ছেদ্য এক অনুষঙ্গ। এই ভূখণ্ড, এর মানুষ, এর নদী-খাল-বিল, কাদামাটি ও শৈশবÑসব মিলিয়ে মাদারীপুর তাঁর সাহিত্যজীবনের এক নীরব অথচ শক্তিশালী ভিত্তি।
সুনীলের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ অর্ধেক জীবন-এর সূচনা ও সমাপ্তি বাংলাদেশকে ঘিরেÑএটি নিছক কাকতালীয় নয়, বরং তাঁর মানসিক মানচিত্রের একটি গভীর স্বীকৃতি। তিনি নিজেই সেখানে শৈশবের গ্রাম, পারিবারিক পরিমণ্ডল ও দেশভাগের অভিঘাতের কথা স্মরণ করেছেন অনিবার্য আবেগে। আবার তাঁর বহুল আলোচিত উপন্যাস পূর্ব পশ্চিম-এ দেশভাগ ও দুই বাংলার ইতিহাস-বাস্তবতা এক মহাকাব্যিক আখ্যানরূপে উপস্থিত হয়েছে। একইভাবে একা এবং কয়েকজন, অর্জুন কিংবা মনের মানুষ-এর বিস্তৃত পরিসরেও পূর্ববাংলার স্মৃতি, চরিত্র ও জীবনদর্শনের অনুরণন লক্ষ্য করা যায়।
শুধু কল্পকাহিনি নয়Ñপ্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, ভ্রমণলেখা ও নিবন্ধে তিনি বাংলাদেশকে নিয়ে লিখেছেন স্বতন্ত্রভাবে প্রায় আশিটিরও বেশি রচনা। বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও কলামেও বারবার ফিরে এসেছে মাদারীপুরের কথা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অকুণ্ঠ সমর্থক; কলকাতায় বসে বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। এই দায়বদ্ধতা ছিল তাঁর আত্মপরিচয়ের অংশ, কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়।
এই গ্রন্থ “আমার মাদারীপুর” মূলত সেইসব লেখার একটি সংকলন, যেখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের রচনায় মাদারীপুর ও তার পারিপার্শ্বিক ভূগোল, মানুষ ও স্মৃতির ছাপ সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানে মাদারীপুর কেবল একটি স্থান নয়; এটি এক অন্তর্লোক, এক মানস-ভূমি, যেখানে শৈশবের নির্মলতা, হারানোর বেদনা, দেশভাগের ক্ষত এবং পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা একসূত্রে গাঁথা। তাঁর ভাষায় গ্রামবাংলা কখনো নস্টালজিয়ার রঙে রাঙা, কখনো বাস্তবতার কঠিন আলোয় উন্মোচিত; কিন্তু সর্বদাই জীবন্ত ও মানবিক।
এই সংকলনের উদ্দেশ্য সুনীল-সাহিত্যে মাদারীপুরের উপস্থিতিকে নতুন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা। বিশেষত পাঠকদের জন্য এটি আত্মপরিচয়ের এক পুনরাবিষ্কার। কারণ, যে লেখক কলকাতায় বসে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সমান্তরালে হেঁটেছেন, তিনি হৃদয়ের গভীরে বহন করেছেন বাংলাদেশের একটি গ্রামÑমাইজপাড়া।
২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁর প্রয়াণ হলেও, সাহিত্যিক উত্তরাধিকারে তিনি আজও দুই বাংলার এক সেতুবন্ধন। “আমার মাদারীপুর” সেই সেতুরই এক বিনম্র দলিলÑএকজন লেখকের শৈশবভূমির প্রতি আজীবন অটুট প্রেমের স্মারক।