পুড়ে গেলে চেনা ঘরও অচেনা হয়ে যায়| যেমন হয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক বাড়িটি | পুড়িয়ে দেয়া হলো, বুলডোজারের নিচে চূর্ণ হলো| বাঙালির গৌরব, সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ এর স্বাক্ষী সেই ঐতিহাসিক বাড়িটি| ধ্বংস হয়ে গেছে বাড়ির তিনটি তলায় জমানো সব ঐতিহাসিক ও পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন| স্বাধিকার আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের জন্ম ও ১৯৭৫ সালের ঘটনা পার হয়ে ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আবারও এক ইতিহাস জন্মাল ৬৩ বছর বয়সী বাড়িটি নিয়ে| বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সূত্র ধরে ৩২ নম্বরের এ বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়|
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন ১৯৬১ সালের অক্টোবরে| এরপর এই বাড়ির ওপর দিয়ে বয়ে গেছে ইতিহাসের নানা প্রবাহ| ১৯৬২ সালের আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা নানা আন্দোলনের পথ ধরে এসে ঠেকে ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে| এরপর একে একে আসে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান আর ১৯৭০ সালের নির্বাচন| ৩২ নম্বরের এই বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্দেশনা দিতেন, জনসংযোগ চালাতেন| ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর ৩২ নম্বর বাড়ি থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র দিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান|
১৯৫০-এর দশকে মুজিব পরিবারের ঢাকা শহরে স্থায়ীভাবে বসবাসের জায়গা ছিল না| রাজনৈতিক কারণে অনেকেই পরিবারটিকে বাসা ভাড়া দিতে অনীহা দেখাতেন| ১৯৫৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমান মন্ত্রী থাকাকালে তাঁর একান্ত সচিব নূরুজ্জামান বেগম মুজিবের অনুরোধে ধানমন্ডি এলাকার জমির জন্য গণপূর্ত বিভাগে আবেদনপত্র জমা দেন| ১৯৫৭ সালে ছয় হাজার টাকায় ধানমন্ডিতে এক বিঘা জমি বরাদ্দ পান তাঁরা| সেখানে প্রথমে দুই কক্ষ বিশিষ্ট একতলা বাড়ি তোলা হয়| বাড়িটিতে তখন মাত্র দুটি শোবার ঘর ছিল| একটিতে থাকতেন সস্ত্রীক শেখ মুজিবুর রহমান, অন্যটিতে তাঁর মেয়েরা| একটি রান্নাঘর বানানো হয়েছিল| সেটির একপাশে থাকতেন তাঁর দুই ছেলে| ১৯৬৬ সালে দোতলায় পরিবারটির বসবাস শুরু হলে নিচ তলার নিজেদের শোবার ঘরটি গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান| বাড়িতে ঢুকতেই ছিল ছোট একটি কক্ষ| সেটি ব্যবহৃত হতো ড্রয়িং রুম হিসেবে| তৃতীয় তলা তৈরি হয়েছে বহু পরে|পুড়ে যাওয়ার আগে পুরো বাড়িটিকেই রূপান্তর করা হয়েছিল জাদুঘরে| প্রতিটি কক্ষ ছিল ঐতিহাসিক নানা স্মৃতিচিহ্ন দিয়ে সাজানো| জাদুঘরে থাকা বিভিন্ন প্রদর্শন সামগ্রীর মধ্যে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যবহার করা পাইপ, চশমাসহ পরিবারের বিভিন্ন তৈজস| ছিল শেখ রাসেলের খেলনা| ছিল নিহত হওয়ার সময় মুজিব পরিবারের সদস্যদের গায়ে থাকা পোশাকগুলো| এখন সবই প্রায় ভস্ম| কিছু লুটপাটও হয়েছে| ১৯৮১ সালে বঙ্গবন্ধুর বড় মেয়ে শেখ হাসিনা বাড়িটি ফিরে পাবার পর বাড়িটিকে তিনি জাদুঘরে রূপান্তরের জন্য বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের কাছে হস্তান্তর করেন| এর নাম হয় ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর’| মূল বাড়িটির পেছনে জাদুঘরের জন্য ছয়তলা আরেকটি ভবনও ˆতরি করা হয়| জাদুঘরের উদ্বোধন হয় ২০১১ সালে| জাদুঘরের ১০ হাজারের বেশি নিদর্শনের সবই ভস্মীভূত হয়ে গেছে| এ বাড়ির বাইরে ধানমন্ডি লেকের ধার ঘেঁষে উন্মুক্ত চত্বর| সেখানে ছিল শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল| সেটি এখন অন্তর্হিত| বাড়ির প্রবেশপথে নিচতলায় ছিল আরেকটি ম্যুরাল| সেটির মুখ বিনষ্ট| ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বাড়িটির দোতলার সিঁড়িতে বুলেটের আঘাতে লুটিয়ে পড়েছিলেন শেখ মুজিব| দেয়ালে সেই বুলেটগুলোর চিহ্ন ছিল কাচ দিয়ে আবৃত| কাচ ভেঙে সেসব দাগ এখন উন্মুক্ত| ১৯৮১ সালে বাড়িটি ফিরে পাওয়ার সময়ও দোতলার সিঁড়িতে ছিল শেখ মুজিবের রক্তের দাগ| সে দাগ অক্ষুণ্ন ছিল এতগুলো বছর ধরে| এবারের আগুন মুছে দিয়েছে সেই রক্তচিহ্ন| একই আগুনে পুড়ে গেছে বাড়িটির সঙ্গে আমাদের ইতিহাসের বহু স্মারক| মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী এই বাড়িটি|যত দিন বাংলাদেশ থাকবে, তত দিন জয় বাংলা থাকবে, তত দিন বঙ্গবন্ধু থাকবে| বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের পিতা থাকবেন| মফিজুর রহমানের সহযোগিতায় ‘মানুষের বাড়ি ধানমন্ডি ৩২’ নামে লেখক কামাল উদ্দিন-এর মলাটবন্দী নির্মম ট্র্যাজেডি একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরির সুতীব্র আর্তনাদ| কানপাতালেই শোনা যাবে অগ্নিক্ষরা দিনে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার প্রমত্ত ধ্বনি|