প্রশ্ন উঠে বর্তমান বিজ্ঞান প্রভাবিত যুগে প্রাচীন ও মধ্যযুগের দর্শন অধ্যয়ের গুরুত্ব কী? অতীতের কল্পনাপ্রবণ দর্শনের ইতিবৃত্ত অধ্যয়নের সার্থকতা কোথায়? একথা অবশ্য অস্বীকার করা যায় না যে, অতীতের যে পরিবেশে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যে দর্শনচর্চার সূত্রপাত হয়, সেই পরিবেশ আজকের বিজ্ঞান প্রভাবিত পরিবেশের তুলনায় ছিল অধিকতর প্রতিকূল। প্রাচ্য ও প্রতীচ্য উভয় ধারাতেই সেদিন যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণের তুলনায় কল্পনা, ধ্যান, অনুধ্যান ও স্বজ্ঞার ভূমিকা ছিল অত্যধিক। কিন্তু এই অজুহাতে আমরা অতীতের দার্শনিক চর্চার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তাকে আদৌ অস্বীকার করতে পারি না, কেননা এসব স্বাজিক ও কল্পনাপ্রসূত চিন্তাধারার ওপর ভিত্তি করেই রচিত হয়েছে বর্তমান কালের উন্নততর দার্শনিক কর্মকাণ্ড। দর্শনের ক্ষেত্রে তার অতীতকে বাদ দিয়ে বর্তমানকে কখনও বিচার করা যায় না। তাই দর্শনের ক্ষেত্রে তার অতীত ইতিবৃত্তের গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকে আবার এ ধরনের মন্তব্যও করেন যে, দর্শনে যেহেতু সর্বজনস্বীকৃত কোনো মত ও পথ নেই, সে-কারণে তার ইতিহাস চর্চায় মানবসভ্যতার কোনো অগ্রগতি সাধিত হতে পারে না। দর্শনে যে-সমস্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়, সে-সমস্ত বিষয়ে যেহেতু বিভিন্ন পণ্ডিত বিভিন্ন মত প্রদান করেন, সে-কারণে তাদের মতে কোনো সর্বজনগ্রাহ্য সত্যের খোঁজ পাওয়া যায় না। আর এ কারণেই এর ইতিহাসচর্চা সময় ও শ্রমের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু এ ধরনের মন্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। জ্ঞানচর্চায় পার্থিব লাভ-লোকসানের কোনো ভূমিকা নেই। শ্রীমদ্ভগবদগীতা-য়ও এ-কথার সমর্থন রয়েছে। অজানাকে জানার, অদৃশ্যকে দেখার, রহস্যাচ্ছন্ন বিষয়কে উন্মোচিত করার আকাঙ্ক্ষা মানুষের জন্মগত। মানুষ যখন শান্ত-সৌম্য নীলাকাশের দিকে চোখ মেলে তখন অতি স্বাভাবিক প্রবৃত্তিবশেই সে তার উৎপত্তি জানতে চায়। আপনার অভা-সৌষ্ঠব দেখে অতি স্বাভাবিকভাবেই তার মনে প্রশ্ন জাগে কোথা থেকে সে এসেছে, কোথায়ই বা তার পরিণতি? এ-ধরনের জিজ্ঞাসাকে পার্থিব সীমারেখা দ্বারা নির্দিষ্ট করা যায় না। তাড়াতাড়ি এর নিবৃত্তিও সম্ভব নয়। একটা বিষয় জ্ঞাত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গেই মানুষের অনুসন্ধিৎসু মন আরও একটি বিষয় জানার দিকে আকৃষ্ট হয়। এভাবেই চলে মানুষের অজানাকে জানার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। তাই দর্শনে তার প্রাচীন ইতিহাসকে জানা একান্ত অপরিহার্য।