শিশুসাহিত্য আমাদের অন্য সাহিত্য বলতে যা বুঝি ঠিক তেমনটি নয়। এই সাহিত্য শিশুদের উপযোগী সাহিত্য; একসময় নীতি-নৈতিকতা, রূপকথা, ভূত-প্রেত্মের কথা থাকলেও এই ধারা এখন কিছুটা পাল্টেছে। রাজনৈতিক, সামাজিক বিষয় ছাড়াও ইতিহাস বিকৃতি, স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের উত্থানসহ কৌতুকহাস্য নানাবিধ বিষয় উঠে আসে এই শিশুসাহিত্যে। আবার এই সাহিত্য শিশুর মনন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক সময় শিশুদের মনোরঞ্জনের জন্য একমাত্র ছড়াসাহিত্য ব্যবহৃত হলেও এখন আর ছড়া এসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই ছড়া বা শিশুসাহিত্যে উঠে আসে জীবন জটিলতার নানা সম্ভাবনা ও উপলব্ধি। বাংলা ভাষায় ভাবপ্রকাশের যতগুলো শিল্পমাধ্যম রয়েছে শিশুসাহিত্য তার মধ্যে অন্যতম। আবার শিশুসাহিত্যের মধ্যে ছড়া বিশাল স্থান দকল করে আছে। যে কারণে শিশুসাহিত্য বলতে এক অর্থে ছড়াকেই বুঝে থাকি। এক সময় শিশুসাহিত্যকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হত না। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেও এই ছড়া সাহিত্য নিয়ে একটা গুরু গম্ভীর প্রবন্ধ লিখেছিলেন। বুদ্ধদেব বসুও এই ছড়াসাহিত্য নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন যা তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই ছড়াসাহিত্যে মানব জীবনের হাসি-কান্না, দুঃখ, ব্যথা-বেদনার কথা উঠে এসেছে। শুধু তাই নয় ছড়ার মধ্য দিয়ে ব্যঙ্গাত্মকভাবেও অনেক কথা বলেছেন শিশুসাহিত্যিকেরা। শুধু ছড়া নয় শিশুদের উপযোগী যে কোন সাহিত্য শিশুদের মনস্তত্ত্ব গঠনে বিরাট ভূমিকা পালন করে। অন্নদাশঙ্কর রায় উইট ব্যবহারের মধ্য দিয়ে ছড়া সাহিত্যেকে আধুুনিক করে তুলেছেন। বুদ্ধদেব বসু তো সুকুমার রায়ের শিশু রচনাকে ছড়া না বলে কবিতা বলেছেন। কারণ তিনি মনে করেন ছড়া হতে হলে আলাদা, একটা কবিতার থেকে পার্থক্য থাকতে হবে। যাক সেসব কথা আমি বাকবিতণ্ডাতে যাব না। আধুনিক ছড়া সাহিত্য বা শিশুসাহিত্য কথা বলতে হলে সেটা তো রবীন্দ্রনাথের হাত ধরেই এসেছে। যা পরবর্তীতে ডালপালা গজিয়ে বিকশিত হয়েছে। সুকুমার রায়কেও আমরা এই ধারা থেকে পৃথক করতে পারি না। ছড়া বা শিশুসাহিত্যকে যারা বিকশিত করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, সুকুমার রায়, দক্ষিণারঞ্জন মিত্রমজুমদার, কাজী নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ এয়াকুব আলী চৌধুরী, ইব্রাহিম খাঁ, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, বন্দে আলী মিয়া, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, জসীম উদদীন, কাজী কাদের নেওয়াজ, ফররুখ আহমদ, মোহাম্মদ নাসির আলী, শওকত ওসমান, আতোয়ার রহমান, আবদুল্লাহ আল-মুতী শরফুদ্দিন, বেগম সুফিয়া কামাল, আশরাফ সিদ্দিকী, রোকনুজ্জামান খান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, আলী ইমাম, মাহবুব তালুকদার, লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম, আনজিন রিটন। এছাড়াও শিশু সাহিত্য নিয়ে বর্তমানে অনেকে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। যা বর্তমানে অনেকটা প্রশংসারও দাবি রাখে।
শিশুসাহিত্য নিয়ে গবেষণার কাজ করতে এসে সত্যিই আমি হতাশ হয়েছি। আমাদের এপার বাংলা কিংবা ওপার বাংলাতে শিশু সাহিত্য নিয়ে সেভাবে কোন উল্লেখযোগ্য গবেষণার কাজ আমার দৃষ্টিগোচর হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অল্প-স্বল্প একাডেমিক গবেষণা হয়েছে। তাতে ছড়ায় প্রতিফলিত সমাজচিত্র কিংবা ইতিহাসের অনুষঙ্গ আলোচিত হয়নি। শিশুসাহিত্যের শিল্পরূপ বা ছড়ার তাত্ত্বিক দিকও খুব একটা উঠে আসেনি। সেই হতাশার জায়গা থেকে শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ শুরু করি। ওপার বাংলার দাদা ড. শেখর রায়ের সাথে কথা হয় সেও আমাকে লেখা দিয়ে সাহায্য করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ড. শেখর রায় ওপারের লেখকদের কাছ থেকে বারবার তাগাদা দিয়ে লেখা সংগ্রহ করেন। তাঁরাও অনেক কষ্ট করে, হাতে লিখে লেখা দিয়েছেন-এজন্য তাদের কাছেও আমি ঋণী। আমাদের শিশু সাহিত্য নিয়েও অনেক অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে কিন্তু কেউ এই শাখাটা নিয়ে হয়তো কাজ করার আগ্রহ পোষণ করেননি। আমাদের এপার বাংলার লেখাগুলো বিভিন্ন পত্র পত্রিকা কিংবা বই পুস্তক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। যে কারণে আমি পত্র পত্রিকার সম্পাদক কিংবা গ্রন্থের লেখকদের কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
আমার দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফলে এই গ্রন্থে যে লেখাগুলো সূচিভুক্ত হয়েছে তা নিম্নরূপÑবাংলাদেশের শিশু সাহিত্য অতীত এবং ভবিষ্যৎÑ আতোয়ার রহমান, বাংলাদেশের শিশু সাহিত্যের ইতিহাসÑ ড. নিতাই বসু, বাংলাদেশের ছড়াÑ সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, ইদানীংকার শিশু-কিশোর ছড়া ও কবিতাÑ হায়াৎ মামুদ, বিশ শতকের বাংলাদেশ: সাহিত্যের ক্রমবিকাশ Ñ লুৎফর রহমান রিটন, আমাদের শিশু সাহিত্য : প্রবণতাসমূহÑ হায়াৎ মামুদ, অমর একুশের পঞ্চাশ বছর: বাংলাদেশ শিশু সাহিত্য Ñআহমাদ মাজহার। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’: একটি পাঠ পর্যালোচনাÑ পবিত্রকুমার মি¯ী¿, ঠাকুরমার ঝুলিÑ ড. শকুন্তলা দাস, সুকুমার রায়ের ‘আ বোল তা বোল: শব্দ নির্মাণ Ñজয়ন্ত বিশ্বাস, চাঁদের পাহাড়: কৈশোরে দৃষ্টির মরমী আলোকেÑ গৌতম মুখোপাধ্যায়, শিশু-সাহিত্যিক জসীম উদদীনÑ ডক্টর তারেক নাথ চট্টোপাধ্যায়, বাংলা শিশুসাহিত্যে লীলা মজুমদারÑ ড. শেখর রায়, একটি নিখাত শিশু সাহিত্য: প্রসঙ্গ ‘ভাড়াটে চাই’Ñড.সুধাংশু কুমার সরকার, জীবন শিল্পী সত্যজিৎ রায় ও ‘বাদশাহী আংটি’Ñ ড.দীনবন্ধু কুন্ডু, শিশু-কিশোর সাহিত্যে শামসুর রাহমানÑ মিলন কান্তি সতপথী, সবুজ দ্বীপের রাজা: সন্তুর দুঃসাহসিক যাত্রা অভিযানÑ ড. রিয়া চ্যাটার্জী। যারা লেখা দিয়ে; পরামর্শ দিয়ে আমাকে সাহায্য করেছেন তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। এ কাজে তরুণ কবি ও গবেষক বঙ্গ রাখালকে পাশে পেয়েছি। তার প্রতিও আমার ভালোবাসা রইল। কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি তৃণলতা প্রকাশ-এর স্বত্ত্বাধিকারী জাহাঙ্গীর আলম ভাইকে। যার আগ্রহে প্রকাশিত হচ্ছে দুই বাংলার শিশুসাহিত্য। তাঁর আগ্রহ ছাড়া হয়তো এত তাড়াতাড়ি এই বইটি আলোর মুখ দেখতো না।