খাদ্য ঘাটতি থেকে খাদ্য উদ্বৃত্তির দেশে উত্তরণ ঘটাতে স্বাধীনতা পরবর্তী প্রায় পঞ্চাশ বছর পার করতে হয়েছে। সাড়ে সাত কোটি মানুষের অন্ন সংস্থানের জন্য বিদেশ থেকে চাল আমদানি করতে হতো। দেশে দ্রুত জনসংখ্যা বেড়ে বর্তমানে আঠারো কোটি অতিক্রম করছে। দেশে মানুষ বাড়লেও জমি বাড়েনি; বরং প্রতি বছর প্রায় অর্ধ শতাংশ হারে জমি কমছে। প্রতিনিয়ত কোথাও না কোথাও ফসলি জমিতে তৈরি হচ্ছে বসতভিটা। তারপরও কৃষক থেমে নেই- তারা শ্রমে ও ঘামে মাঠে ফসল উৎপাদনের জন্য নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের চেষ্টা থাকে অল্প জমিতে কিভাবে অধিক ফসল ফলানো যায়। সময় মত জমি চাষ, সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন এবং নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করছেন। নতুন ফসল দেখে আনন্দে তার বুক ভরে যায়। কবির ভাষায় তার অস্ফুট কণ্ঠে বেজে ওঠে 'আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে'! কিন্তু আনন্দের রেশ তার মনে বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। নতুন ফসলের ন্যায্য দাম প্রাপ্তি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন। ফসল ঘরে তুলতেই তার মন বিষন্নতায় ভরে যায়।
কৃষক যখন বাজারে যায় তখন ফসলের ন্যায্য দাম পায় না। ক্রেতার অভাব। দামদস্তুর করতে গেলে উৎপাদন খরচও ওঠে না। ফসল বিক্রি করে দৈনন্দিন সওদা-পাতি কিনতে হবে, গৃহস্থালি অন্যান্য দ্রব্যাদি ক্রয় করে ঘরে ফিরতে না পারলে এক অসনীয় যন্ত্রণা বুকে নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়। সংসারের অতি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কিনতে না পারায় পরিবারে অশান্তি লেগেই থাকে। এক বছর যে ফসল বিক্রি করে ভাল দাম পেলো তো পরের বছর দাম পায় না, উৎপাদন বাড়লে দাম কমে যায়। কখনো কখনো পানির দামেও পণ্য বিক্রি হয়। মৌসুমে স্বল্পমূল্যে ফসল বিক্রি করে লোকসান গুণতে হয়। দায়দেনা বাড়তে থাকে, তারা দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র হতে থাকে। অতএব একসময় তাদের নাম হত-দরিদ্র্যের খাতায় লেখাতে হয়।
দেশে খাদ্য শস্য, মাছ, ফল, মাংস, দুগ্ধ, ডাল, উৎপাদনে কৃষকের অবদান অনস্বীকার্য। মাংস উৎপাদনে গবাদি পশুর পরিচর্যায় তারা নিবদ্ধ থাকে। উন্নয়নের বড় ক্ষেত্র কৃষি হলেও এর মূল হোতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই অত্যন্ত তৎপর হতে হবে এবং দেশের উন্নয়নে দরকার কৃষি-বান্ধব সরকার। কৃষি বাঁচলে কৃষক বাঁচবে, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে, কৃষি উপকরণ, সার, বীজ, কীট নাশক সহজে কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হবে। ফল-মূল, শাক-সব্জি উৎপাদন মৌসুমে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং যে সব মৌসুমি ফল বিদেশে রফতানি করা যায় তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কৃষি ঋণ বিতরণ সহজী করণ করতে হবে। কোন ফসল উৎপাদনের সময় কৃষককে কি পরিমাণ ঋণ দেয়া দরকার এবং বিতরণকৃত টাকা সরকারি কোষাগারে কিভাবে ফেরৎ আনা যায় তার সহজ বন্দোবস্ত থাকা দরকার।
ড. জাহাঙ্গীর আলম একজন বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবীদ। তিনি একজন প্রখ্যাত গবেষক। কৃষি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করছেন। ফল স্বরূপ সরকার তাকে কৃষি উন্নয়নে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার এবং একুশে পদকেও ভূষিত করেছে। কর্মজীবনে তিনি গবেষণার পাশাপাশি শিক্ষকতার কাজেও নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ এর উপাচার্য, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট এর মহাপরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের সদস্য-পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা স্কুল অব ইকনোমিক্স এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
এ বইয়ে অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম কৃষকের উৎপাদনের চাকা কোথায় কোথায় থেমে যায়, কেন থেমে যায় তার কারণ উদঘাটনের চেষ্টা করেছেন। তিনি এ বইয়ে দেখিয়েছেন, কৃষকদের জন্য সরকার কিভাবে কাজ করতে পারে, কৃষির কোন কোন জায়গায় বিনিয়োগ করা দরকার। তিনি শুধু কৃষির সমস্যার কথাই বলেননি, বিরাজমান সমস্যা কিভাবে সমাধান করা যায় তার পথও দেখিয়েছেন। তার লেখায় গতি আছে, আছে ছন্দময়তা আর তথ্য ও তত্ত্ব।
আমরা মনে করি, কৃষি বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করেন, কৃষির যারা উন্নয়ন চান, দেশে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হরহামেশা কথা বলেন তাদের ড. জাহাঙ্গীর আলমের লেখা 'কৃষি : সমস্যা ও সম্ভাবনা' অবশ্যই পাঠনীয়।
কৃষি বিষয়ে লেখক আরও সারগর্ভ রচনায় আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর জ্ঞানগর্ভ রচনা গবেষকদের জ্ঞান তৃষ্ণা নিবারণে সহায়ক হবে।