পলিটিক্স অ্যামং নেশনস: ক্ষমতা ও শান্তির সংগ্রাম (Politics Among Nations: The Struggle for Power and Peace) আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী বই। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত এই বইটির মাধ্যমে হান্স জে. মর্গেনথাউ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে 'বাস্তববাদ' (Realism) বা 'ধ্রুপদী বাস্তববাদ'-এর ভিত্তি স্থাপন করেন।
বইটির মূল বিষয়বস্তু ও গুরুত্ব নিচে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
## ১. মূল দর্শন
মর্গেনথাউয়ের মতে, আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোনো আদর্শ বা নৈতিকতার ওপর চলে না, বরং এটি ক্ষমতার (Power) ওপর ভিত্তি করে চলে। তাঁর বিখ্যাত উক্তি হলো— "আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অন্য সকল রাজনীতির মতোই ক্ষমতার লড়াই।"
## ২. বাস্তববাদের ছয়টি নীতি (Six Principles of Political Realism)
এই বইটিতে তিনি বাস্তববাদের ছয়টি মূল নীতির কথা বলেছেন:
* রাজনীতি বস্তুনিষ্ঠ আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত: মানুষের স্বভাব যেমন অপরিবর্তনীয়, রাজনীতিও তেমনি কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে চলে।
* স্বার্থ সংজ্ঞায়িত হয় ক্ষমতার মাধ্যমে: দেশগুলো তাদের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষমতার নিরিখে বিচার করে।
* ক্ষমতার রূপ পরিবর্তনশীল: স্বার্থ এবং ক্ষমতার অর্থ সময়ের সাথে বদলাতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার লড়াই চিরন্তন।
* নৈতিকতার সীমাবদ্ধতা: বিমূর্ত নৈতিক নীতি সরাসরি রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে প্রয়োগ করা যায় না। রাষ্ট্রকে অবশ্যই তার টিকে থাকার কথা আগে ভাবতে হয়।
* রাষ্ট্রের নৈতিকতা বনাম সার্বজনীন নৈতিকতা: কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের নৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে মহাবিশ্বের নিয়ম ভাবা ভুল।
* রাজনৈতিক ক্ষেত্রের স্বায়ত্তশাসন: একজন অর্থনীতিবিদ যেমন লাভের কথা ভাবেন বা একজন আইনজীবী যেমন আইনের কথা ভাবেন, একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষককে ক্ষমতা ও জাতীয় স্বার্থের নিরিখে রাজনীতিকে বিচার করতে হবে।
## ৩. জাতীয় ক্ষমতা ও শান্তি
মর্গেনথাউ মনে করতেন, বিশ্ব শান্তি কোনো আদর্শবাদ বা বিশ্ব সরকারের মাধ্যমে নয়, বরং শক্তির ভারসাম্য (Balance of Power) এবং দক্ষ কূটনীতির (Diplomacy) মাধ্যমে বজায় রাখা সম্ভব।
## কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যখন দেশগুলো আদর্শবাদের পরিবর্তে জাতীয় নিরাপত্তা ও ক্ষমতার রাজনীতিতে গুরুত্ব দিচ্ছিল, তখন মর্গেনথাউয়ের এই বই বিশ্ব রাজনীতির গতিধারা বোঝার একটি বৈজ্ঞানিক কাঠামো প্রদান করে। আজও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ছাত্র ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এটি একটি অপরিহার্য টেক্সট।