বিমল কর-এর উপন্যাস সমগ্র-এর দুটি খণ্ডের পর এবার তৃতীয় খণ্ড। এই খণ্ডে আটটি রচনা সংগৃহীত হল। এর মধ্যে ‘কেরানীপাড়ার কাব্য’, ‘ওই ছায়া’ এবং ‘এই প্রেম, আঁধারে’ লেখকের সাহিত্যজীবনের প্রথম পর্বে রচিত। লক্ষ করার বিষয়, ‘কেরানীপাড়ার কাব্য’ গ্রন্থটিতে উপন্যাসের প্রচলিত ছক একেবারেই অনুপস্থিত, এই রচনাটিতে কোনও কাহিনীসূত্র, নায়ক-নায়িকা ইত্যাদি নেই। সাধারণ একটি পাড়া, তখনকার দিনের রেলওয়ে কলোনি এবং বছরের চারটি প্রধান ঋতুই রচনার মূল সুর, সেই সঙ্গে অজস্র ও বিচিত্র চরিত্র। ‘ওই ছায়া’ উপন্যাসটিতে নামেমাত্র নায়ক থাকলেও সম্পূর্ণ কাহিনীটি একাধিক উপেক্ষিত ক্ষুব্ধ চরিত্রের পটচিত্রে গড়ে উঠেছে। ‘এই প্রেম, আঁধারে’ রচনাটির মূল প্রশ্ন, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলতা যদি বা থাকে—মানুষের হৃদয় কি সেখানে নিঃসাড়, না, নির্বিকার! উপন্যাস লেখার ক্ষেত্রে লেখক প্রথম জীবন থেকেই যে উপন্যাস রচনার প্রচলিত প্রথা মানেননি তা দেখা যায়। আবার পরবর্তীকালে তাঁর রচিত ‘দ্বীপ’, ‘এ আবরণ’ একইভাবে স্বীকৃত আঙ্গিক থেকে পৃথক। তবে বিমল করের রচনায় আঙ্গিকই একমাত্র বিবেচ্য বিষয় নয়। ‘ভুবনেশ্বরী’ উপন্যাসটিতে যে যথার্থ সত্যের অন্বেষণ করা হয়েছে তা হয়তো বা নির্মম, কিন্তু উপেক্ষা করা চলে না। ‘দ্বীপ’ উপন্যাসে আঙ্গিকগত নতুনত্ব ছাড়াও মানুষের অস্তিত্বের গভীর বেদনাকে স্পর্শ করা যায়। ‘যদুবংশ’ লেখকের একটি জনপ্রিয় উপন্যাস। এই প্রজন্মের যুবকদের আত্মক্ষয় যে শুধুমাত্র সামাজিক, পারিবারিক ও পরিবেশগত কারণেই ঘটে না—ব্যক্তিগত মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও বেদনার কারণে ঘটে থাকে—তা স্বীকার করে নেওয়া ভাল। ‘এ আবরণ’ অথবা ‘সংশয়’ আমাদের জীবন সম্পর্কে একাধিক প্রশ্ন, সম্পর্কের জটিলতা, সুখ-দুঃখ-আনন্দকে যথাসম্ভব ফুটিয়ে তুলেছে। সাধারণত বলা হয়ে থাকে, বিমল করের রচনায় মানুষের মনের স্পষ্ট ও অস্পষ্ট রেখাগুলি দেখানোর চেষ্টা থাকে। যদিও এ-সত্য অস্বীকার করা যাবে না, তবুও হয়তো বলা ভাল যে, লেখকের সমস্ত রচনাতেই একটি মূল প্রশ্ন—জীবন সম্পর্কে—বরাবরই থেকে যায়। লেখক হিসেবে বিমল করের বৈশিষ্ট্য শুধু নিবিড় ভাষায়, প্রকৃতি বর্ণনায় অথবা সাধারণ জীবন-জিজ্ঞাসায় সীমাবদ্ধ নয়, আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রসঙ্গটিও সেই বোধের অন্তর্ভুক্ত।
বিমল করের জন্ম ৩ আশ্বিন ১৩২৮, ইংরেজি ১৯২১। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। জব্বলপুর, হাজারিবাগ, গােমাে, ধানবাদ, আসানসােল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন : ১৯৪২ সালে এ.আর.পি.-তে ও ১৯৪৩ সালে আসানসােলে মিউনিশান প্রােডাকশন ডিপােয়। ১৯৪৪-এ রেলওয়ের চাকরি নিয়ে কাশী মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরাগ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, পরে পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকা ও ‘সত্যযুগ’-এর সাব-এডিটর। এ-সবই ১৯৪৬ থেকে '৫২ সালের মধ্যে। ১৯৫৪-১৯৮২ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২-১৯৮৪ ‘শিলাদিত্য মাসিক পত্রিকার সম্পাদক। বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৭ এবং ১৯৯২। আকাদেমি পুরস্কার ১৯৭৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার ১৯৮১। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার ১৯৮২। ‘ছােটগল্প—নতুন রীতি’ আন্দোলনের প্রবক্তা ।