উপন্যাসসমগ্র ষষ্ঠ খণ্ডে সংগৃহীত উপন্যাসের সংখ্যা তিন। প্রথম উপন্যাস ‘দেওয়াল’। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীকাল পার হয়েছে—যাট বছরের বেশি, এই দীর্ঘ সময়ে আমরা অনেক কিছু ভুলে গিয়েছি। কিন্তু এটা মনে রাখা প্রয়োজন যে মানুষের সভ্যতা, সংকট যেভাবে দেখা দিয়েছিল সেই উনিশশো উনচল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ পর্যন্ত যাকে আমরা আজও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বলে উল্লেখ করে থাকি—তার তুলনা বিরল। সমস্ত বিশ্বজুড়ে সে এক অদ্ভুত কাহিনী। পৃথিবীর ইতিহাসে এই যুদ্ধ নিয়ে যত বই বিভিন্ন ভাষায় লেখা হয়েছে এমন আর আগে হয়নি। ভারতের অনেক ভাষায় তো বটেই, এমনকী বাংলা ভাষাতেও সমস্ত বড় লেখকই এই সময় নিয়ে উপন্যাস রচনা করেছেন কিন্তু সে সবই তৎকালীন সময়ে। বিমল করের তখন সদ্য তরুণ বয়স। তিনি সাহিত্যিক সাংবাদিক কিছুই নন, নিতান্তই ছাত্র। কিন্তু এই সময়ের নির্মম অভিজ্ঞতা তাঁর মর্মে গিয়ে এমনভাবে আঘাত করেছিল যে দীর্ঘ এক দশক পরে উনিশশো চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন সালে তিনি লিখতে শুরু করেন ‘দেওয়াল’ উপন্যাসের প্রথম খণ্ড। তখন তিনি সাহিত্যে নবাগত। তারপর দীর্ঘ সাত বছরে তিনি অপর দুটি খণ্ড রচনা করেন। বলা বাহুল্য এই দীর্ঘতম উপন্যাস কোনও পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়নি। তবু এই উপন্যাসটি বিমল করের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস বলে অনেকেই মনে করেন। বাংলা সাহিত্যের নানা জায়গায় বারবার এই উপন্যাসটি উল্লেখ করার প্রয়োজন ঘটেছে। এই খণ্ডের দ্বিতীয় রচনা ‘শমীক’। বাংলা সাহিত্যে যথার্থ ভাবে কোনও নিহিলিস্টিক উপন্যাস রচিত হয়েছে বলে মনে পড়ে না। লেখক বিমল করের সাধ ছিল বাংলা ভাষায় এই রকম একটি উপন্যাস রচনা করার। বাংলার জটিল সামাজিক চিত্র অবলম্বন করে রচিত ‘শমীক’ তার সেই প্রয়াস। তিনি এ কাজে সফল কি না তার বিচার পাঠকের ওপর। ছোট তারা নামে অকালমৃতা যদিচ কাল্পনিক এক অভিনেত্রীর কথা মনে করে ‘গ্রন্থি’ উপন্যাসটি রচিত। অভিনেত্রী মায়ের সঙ্গে ছেলের সম্পর্ক পরস্পরের প্রতি ঘৃণা, ভালবাসা, মায়া, মমতা এত নিভৃতে রচিত হয়েছে যে এই উপন্যাসটিকে লেখকের শ্রেষ্ঠ কাহিনী বলা যায়। ‘নয়নতারা' নামে বিখ্যাত বাংলা কাহিনীচিত্র এই উপন্যাসটি অবলম্বন করে নির্মিত হয়েছিল।
বিমল করের জন্ম ৩ আশ্বিন ১৩২৮, ইংরেজি ১৯২১। শৈশব কেটেছে নানা জায়গায়। জব্বলপুর, হাজারিবাগ, গােমাে, ধানবাদ, আসানসােল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক। কর্মজীবন : ১৯৪২ সালে এ.আর.পি.-তে ও ১৯৪৩ সালে আসানসােলে মিউনিশান প্রােডাকশন ডিপােয়। ১৯৪৪-এ রেলওয়ের চাকরি নিয়ে কাশী মণিলাল বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘পরাগ’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক, পরে পশ্চিমবঙ্গ’ পত্রিকা ও ‘সত্যযুগ’-এর সাব-এডিটর। এ-সবই ১৯৪৬ থেকে '৫২ সালের মধ্যে। ১৯৫৪-১৯৮২ সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮২-১৯৮৪ ‘শিলাদিত্য মাসিক পত্রিকার সম্পাদক। বহু পুরস্কার। আনন্দ পুরস্কার ১৯৬৭ এবং ১৯৯২। আকাদেমি পুরস্কার ১৯৭৫। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় পুরস্কার ১৯৮১। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের নরসিংহদাস পুরস্কার ১৯৮২। ‘ছােটগল্প—নতুন রীতি’ আন্দোলনের প্রবক্তা ।