কবিতা আমার কাছে কেবল শব্দের কারুকাজ নয়, বরং জীবনের দীর্ঘ পথচলায় কুড়িয়ে পাওয়া কিছু দহন, কিছু হাহাকার আর কিছু অবিনাশী ¯^প্নের সমষ্টি| পঞ্চাশোর্ধ্ব এই জীবনে এসে যখন পেছনে তাকাই, দেখি ফেলে আসা দিনগুলো ঠিক যেন এক রূপালি জ্যোৎস্নার মতো স্মৃতির গোরস্তানে খেলা করছে| আমার এই কাব্যযাত্রা সেই স্মৃতি আর বর্তমানের এক নিরন্তর লড়াই|
'সবুজ জমিনে লালপেড়ে শাড়ি' সংকলনের কবিতাগুলো আমার জীবনের কোনো নির্দিষ্ট সময়ের নয়, বরং বিচ্ছিন্ন সব অনুৃতির এক সুতোয় গাঁথা মালা| কখনো পল্লীর নিঝুম রাতের কুয়াশা আমাকে আচ্ছন্ন করেছে, কখনো আবার হেমন্তের হিমের পরশ আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে জরাজীর্ণ কুটিরের আঙিনায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই নিঃ¯^ মানুষগুলোর কথা| আমি যখন 'মতিভ্রম'-এ আবরার, ফেলানী কিংবা বিশ্বজিতের ছায়াদের দেখি, তখন আমার কবিসত্তা কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না; তা হয়ে ওঠে এক সামাজিক দায়বদ্ধতা| আমার বুকের ভেতরের দহন আর কাঁটাতারে ঝুলে থাকা বিচারহীনতার হাহাকার মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সেই নিশুতি রাতের আঁধারে|
পেশাগত জীবনে দীর্ঘ সময় ছাপাখানা আর প্রকাশনার সাথে জড়িয়ে থাকায় অক্ষরের সাথে আমার এক অদ্ভুত সখ্য| কমলাপুর স্টেশনে বসে ট্রেনের প্রতীক্ষায় যখন আমি ফেলে আসা সেই ছাপাখানার গন্ধ খুঁজে ফিরি, তখন আধুনিক যন্ত্রসভ্যতার দাপটে হারিয়ে যাওয়া সেই মায়া আমাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে| শহর আমাকে অনেক দিয়েছে, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে শেকড়ের সেই টান| তাই এই পড়ন্ত বিকেলে আমি আবার ফিরে যেতে চাই সেই জলপাই রঙের বৃষ্টির ঘ্রাণে, যেখানে কোজাগরী পূর্ণিমার চিঠি নিয়ে ডাকপিয়ন আসবে বলে আজও আমি জানালার পাশে প্রতীক্ষায় থাকি|
মানুষের হাসির আড়ালে যে এক সুনিপুণ মুখোশ থাকে, তা চিনতে আমার অনেক দেরি হয়েছে| 'নন্দিতা'র সেই হাসির বর্ম চিরে তার ভেতরের ক্লান্তিকে পড়তে গিয়ে বুঝেছি—ভালোবাসা মানে কাউকে বদলানো নয়, বরং কারো ক্ষতগুলোর ভাষা শিখে তাকে একটি 'নিরাপদ কাঁধ' দেওয়া|
এই বইয়ের প্রতিটি পঙক্তি আমার একান্ত নির্জনতার ফসল| যদি এই কবিতাগুলোর কোনো একটি শব্দও পাঠকের হৃদয়ে সামান্যতম দোলা দেয়, তবেই আমার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর শব্দের সাথে লড়াই সার্থক হবে| সবুজ জমিনের ওপর লালপেড়ে শাড়ির সেই চিরচেনা আঁচল যেন আমাদের প্রত্যেকের আত্মার এক প্রশান্তি হয়ে ধরা দেয়—এই কামনাই করি|
পরিশেষে, কিছু মানুষের ঋণ ¯^ীকার না করলেই নয়| আমার সহধর্মিণী, ঔপন্যাসিক জেবুননেসা রিনা, এই সংকলনের প্রতিটি কবিতার ভূয়সী প্রশংসা করে আমাকে প্রাণিত করেছেন| আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু নিপা নেফারতিতি, যিনি কেবল কবিতাগুলোর প্রশংসা করেই ক্ষান্ত হননি, বরং অনেক শ্রম ও মমতা দিয়ে বইটির প্রচ্ছদ এঁকে দিয়েছেন| আর হরিৎপত্র প্রকাশনীর কর্ণধর জনাব ওমর ফারুকী ভাইয়ের কথা না বললেই নয়; তাঁর নিরন্তর তাগাদা ও পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের বিশেষ আগ্রহ না থাকলে এই সংকলনটি হয়তো আলোর মুখ দেখত না| আপনাদের সকলের কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ|