জনতা নিদ্রায় গেলে : কেন এই বই?
এই বই কোনো রাজনৈতিক দলিল নয়, আবার কোন নিছক কাব্য সংকলনও নয়|
‘জনতা নিদ্রায় গেলে’ মূলত একটি সময়ের নথি যা বিবেকের কথা বলে| এমন একটা সময় যখন রাষ্ট্র কথা বলে বেশি, কিন্তু শোনে কম; যেখানে ক্ষমতা দৃশ্যমান, কিন্তু দায় অদৃশ্য; যেখানে জনতা উপস্থিত, অথচ জাগ্রত নয়|
এই লেখাগুলো জন্ম নিয়েছে প্রশ্ন থেকে| প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে-রাজনীতি কি সত্যিই ˆনতিকতার বাইরে? দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে-ভাষা কি কেবল প্রকাশের মাধ্যম, নাকি দমনের হাতিয়ার? তৃতীয় প্রশ্ন হচ্ছে-ˆ¯^রাচার কি বন্দুক নিয়েই আসে, না-কি সে আসে আইন, নির্বাচন, সংস্কার আর উন্নয়নের ভাষায় মোড়ানো হয়ে? আর সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে প্রশ্ন-আমরা, যারা সব দেখি, সব জানি, তারা কি আদৌ জাগ্রত?
এই গ্রন্থে কবিতা ও প্রবন্ধ পাশাপাশি হেঁটে চলে| কারণ কিছু সত্য আছে, যা প্রবন্ধে বলা যায়; আবার কিছু সত্য আছে, যা কেবল কবিতাই বহন করতে পারে| কবিতা এখানে অলংকার নয়-এটি প্রতিরোধের ভাষা| প্রবন্ধ এখানে ব্যাখ্যা নয়-এটি ˆনতিক অবস্থান| একটির ভেতর দিয়ে অন্যটি কথা বলে, একটির শূন্যতা অন্যটি পূরণ করে| প্রবন্ধ ও কবিতার সাথে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ভাষা ইংরেজীতে কাব্যিক মাধ্যমে অনুভূতির প্রকাশ|
এই বইয়ের কেন্দ্রে রয়েছে রাষ্ট্র-কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সরকারের রাষ্ট্র নয়; বরং সেই রাষ্ট্র, যা ধীরে ধীরে ˆনতিকতা হারায়, ভাষা হারায়, আর শেষ পর্যন্ত মানুষের জীবনকে পরিসংখ্যান ও স্লোগানে রূপান্তর করে| এখানে গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়, বিচার ঝুলে থাকে, ঐক্য শব্দে বাঁচে কিন্তু কাজে ভেঙে পড়ে| এখানে কূটনীতি প্রতিক্রিয়াশীল, সভ্যতা দ্বিধাগ্রস্ত, আর ক্ষমতা বারবার একই ছকে ফিরে আসে-নতুন মুখে, পুরোনো কৌশলে|
এই লেখাগুলো কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ নয়, আবার ইতিহাসের দূরবর্তী গল্পও নয়| এগুলো একটি চলমান বর্তমানের পাঠ| এমন এক বর্তমান, যেখানে “ভুল নেই” বলা হয় সবচেয়ে বেশি, আর সেই কথার আড়ালেই সবচেয়ে বড় ভুলগুলো ¯^াভাবিক হয়ে উঠে| যেখানে “অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু” একটি পরিচিত বাক্য, আর “তদন্ত চলছে” একটি স্থায়ী আশ্বাস|
এই বই কাউকে নির্দেশ দেয় না, পথ দেখায় না, সমাধানও ঘোষণা করে না| বরং এটি পাঠকের সামনে একটি আয়না ধরে রাখে| সেই আয়নায় রাষ্ট্র যেমন দেখা যায়, তেমনি জনতাও দৃশ্যমাণ হয়| কারণ ˆ¯^রাচার কেবল ক্ষমতার ব্যর্থতা নয়; এটি নাগরিক নিদ্রার ফসলও বটে| যখন প্রশ্ন করা বন্ধ হয়, তখনই ক্ষমতা নির্বিচার হয়| যখন জনতা ঘুমায়, তখনই ইতিহাস সবচেয়ে নীরবে রক্তপাত করে|
‘জনতা নিদ্রায় গেলে’ তাই কোনো অভিযোগের গ্রন্থ নয়-এটি একটি সতর্ক উচ্চারণ| এটি বলে না, কী করতে হবে; এটি শুধু জিজ্ঞাসা করে-আমরা কি সত্যিই জেগে আছি?
এই প্রশ্নের উত্তর পাঠক নিজেই দেবেন| এই বই সেই উত্তরের অপেক্ষায়|