রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সোনার তরী' (১৮৯৪) কাব্যগ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যের রোমান্টিক ধারার একটি অনন্য মাইলফলক। এই কাব্যগ্রন্থের মূল আবেদন হলো মানুষের জীবনের কর্ম, মহাকাল এবং মৃত্যুর রহস্যময় সম্পর্ক।
নিচে কাব্যগ্রন্থটির মূল সারমর্ম সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
মহাকাল ও মানুষের কীর্তি
'সোনার তরী' কাব্যের মূল সুর হলো—মানুষ মরণশীল, কিন্তু তার সৃষ্টি বা কর্ম অমর। মহাকালের স্রোতে মানুষ নিজে হারিয়ে যায়, কিন্তু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল বা কর্মটুকুই কেবল টিকে থাকে। এই কাব্যের নাম কবিতায় দেখা যায়, কৃষক (মানুষ) তার ধান (কর্ম) নৌকায় তুলে দিতে পারলেও নৌকায় তার নিজের জায়গা হয় না। অর্থাৎ, পৃথিবী মানুষের কাজটুকু গ্রহণ করে, কিন্তু ব্যক্তি মানুষকে মনে রাখে না।
মর্ত্যপ্রীতি ও প্রকৃতি
রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের নিবিড় সম্পর্কের কথা বলেছেন। এখানে প্রকৃতি কেবল সুন্দর নয়, বরং কখনও কখনও তা রহস্যময়ী এবং নির্দয়। পদ্মা নদীর তীরের জনহীন জনপদ, বর্ষার মেঘলা আকাশ এবং গ্রামবাংলার নিসর্গ চিত্র এই কাব্যের পরতে পরতে মিশে আছে।
জীবনদেবতা ও অসীমের তৃষ্ণা
এই কাব্যে কবির 'জীবনদেবতা' চেতনার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। কবি অনুভব করেছেন যে, তার ভেতরে এমন এক সত্তা আছে যা তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছে। সসীম মানুষের মধ্যে অসীমের যে ব্যাকুলতা, তা এই কাব্যের
সারকথা
সোনার তরী' হলো শূন্যতার হাহাকার এবং সৃষ্টির সার্থকতা—এই দুইয়ের এক অপূর্ব সমন্বয়। মানুষ তার কর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, কিন্তু মহাকালের অমোঘ নিয়মে তাকে বিদায় নিতেই হয়। এই চিরন্তন সত্যটিই রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত নিপুণভাবে এই কাব্যে ফুটিয়ে তুলেছেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম ১৮৬১ সালের ৭ মে (২৫ বৈশাখ ১২৬৮) কলকাতার জোড়াসাঁকোয়। বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় মনীষী এবং বিশ্ববিখ্যাত কবি। ছাপার অক্ষরে স্বনামে তাঁর প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘হিন্দু মেলার উপহার’ (৩০.১০.১২৮১ ব.)।
১৮ বছর বয়সের মধ্যে তিনি ‘বনফুল’, ‘কবিকাহিনী’, ‘ভানুসিংহের পদাবলী’, ‘শৈশব সংগীত’ ও ‘রুদ্রচণ্ডু’ রচনা করেন। ‘জ্ঞানাঙ্কুর’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘ভুবনমোহিনী প্রতিভা’ তাঁর প্রথম গদ্য প্রবন্ধ। ‘ভারতী’র প্রথম সংখ্যায় তাঁর প্রথম ছোটগল্প ‘ভিখারিণী’ এবং প্রথম উপন্যাস ‘করুণা’ প্রকাশিত হয়। ২২ বছর বয়সে নিজেদের জমিদারি সেরেস্তার এক কর্মচারীর একাদশবর্ষীয়া কন্যা ভবতারিণীর (পরিবর্তিত নাম মৃণালিনী) সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয় (৯.১২.১৮৮৩)। পুত্র রথীন্দ্রনাথের শিক্ষা-সমস্যা থেকেই কবির বোলপুর ব্রহ্মচর্য আশ্রমের সৃষ্টি হয় (২২.১২.১৯০১)। সেই প্রতিষ্ঠানই আজ ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’-এ রূপান্তরিত হয়েছে।
১৯১২ সালের নভেম্বর মাসে গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ বা ‘ঝড়হম ঙভভবৎরহমং’ প্রকাশিত হয়। ১৯১৩ সালের অক্টোবরে প্রথম ভারতবাসী রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টরেট (১৯১৪) এবং সরকার স্যার (১৯১৫) উপাধিতে ভূষিত করে।
রবীন্দ্রনাথের একক চেষ্টায় বাংলাভাষা সকল দিকে যৌবনপ্রাপ্ত হয়ে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে নিজের আসন প্রতিষ্ঠা করেছে। কাব্য, ছোটগল্প, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, গান প্রত্যেক বিভাগেই তাঁর অবদান অজস্র এবং অপূর্ব। তিনি একাধারে কবি, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ, সুরকার, নাট্যপ্রযোজক এবং স্বদেশপ্রেমিক। তাঁর রচিত দুই হাজারের ওপর গানের স্বরলিপি আজো প্রকাশিত হচ্ছে। দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের (ভারত ও বাংলাদেশ) জাতীয় সংগীত-রচয়িতারূপে একমাত্র রবীন্দ্রনাথেরই নাম পাওয়া যায়।