বহুধর্মীয় বিশ্ববাস্তবতায় শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কেবল সামাজিক প্রয়োজন নয়; এটি মানবিক দায়িত্ব। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের বৈচিত্র্য যখন কখনো ভুল বোঝাবুঝি ও দূরত্ব সৃষ্টি করে, তখন সংলাপই হয়ে ওঠে পারস্পরিক আস্থা অর্জনের কার্যকর পথ। বিশ্বাসকে প্রতিযোগিতার মঞ্চে নয়, বরং বোঝাপড়ার পরিসরে স্থাপন করার যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক প্রয়াস- এই গ্রন্থ তারই একটি সুসংগঠিত রূপায়ণ। ঐশী জ্ঞানের বহুবিধ ব্যাখ্যা অনুধাবন ও পর্যালোচনা করা এবং বিশ্বাসকে সচেতনভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পারস্পরিক আন্তঃসম্পর্ক সুদৃঢ় করাই যেটির উদ্দেশ্য।
মুসলিম চিন্তাবিদ ত্বহা জাবির আল-আলওয়ানি-এর চিন্তাধারাকে কেন্দ্র করে মুসলিম-খ্রিষ্টান মতবিনিময় ভিন্নমতের স্বীকৃতি দিয়েই ঐক্যের সম্ভাবনা অনুসন্ধান করে। যা মতপার্থক্যকে সংঘাতের-বিরোধের কারণ না বানিয়ে জ্ঞানসমৃদ্ধ আলোচনা, নৈতিক সংযম এবং আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে পারস্পরিক উপলব্ধিকে গভীরতর করার প্রয়াস। সংলাপকে তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং সামাজিক বাস্তবতায় ন্যায়, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠার এক কার্যকর উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মুসলিম নেতৃত্ব ও বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সংঘাত নিরসন, ধর্মীয় আইন ও নাগরিক আইনের সম্পর্ক, পরিবার ও বিবাহব্যবস্থা, ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা, সহিংসতার উৎপত্তি, জাতীয়তাবাদ, বহুত্ববাদী সমাজে বিশ্বাসের অবস্থান এবং বিশ্বাসের দৃঢ়তা ও মানবিকতার সমন্বয় ঘটিয়ে কিভাবে একটি ইনসাফভিত্তিক ও সহিষ্ণু সমাজ গড়ে তোলা যায়- প্রভৃতি বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
এই সংকলন প্রমাণ করে যে আন্তঃধর্মীয় সংলাপ কোনো আপসকামী সমঝোতা নয়; বরং নিজ নিজ বিশ্বাসের স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখেই পারস্পরিক মর্যাদা ও নৈতিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে এগিয়ে চলার একটি পরিণত পদ্ধতি। ধর্মীয় আবেগ, যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ এবং মানবিক অঙ্গীকারের সমন্বয়ে গ্রন্থটি সমকালীন বিশ্বে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এক প্রজ্ঞাপূর্ণ দলিল ও অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ। মানবতার অভিন্ন কল্যাণে বিশ্বাসী পাঠকের জন্য গ্রন্থটি বুদ্ধিবৃত্তিক সততা, নৈতিক সাহস ও সহনশীল মানসিকতার এক অনুশীলন। বহুত্বের ভেতর ঐক্যের সন্ধান এবং ভিন্নতার মধ্যেও সম্মিলিত দায়বোধের চর্চাই এর মূল বার্তা।