ভাষা ছাড়া মানুষ বোবা। মানুষ বোবা তো পৃথিবী বোবা। ভাষার প্রকাশক্ষমতা আছে বলেই মানুষ শ্রেষ্ঠ। পৃথিবীও সচল। প্রয়োজনের তাগিদেই মানুষ ভাষা সৃষ্টি করেছে। ভাষা প্রকাশের উপাদান তথা বাগযন্ত্র প্রাকৃতিক হলেও ভাষা কৃত্রিম। নিজ প্রয়োজনেই মানুষ ভাষা সৃষ্টি করেছে। যদি বন্ধ থাকে মুখ তাহলে কি বুকে থাকে সুখ। থাকে না, সুখ কখনোই থাকে না, থাকে না মনের সান্ত্বনা। বুকের সুখ ও সান্ত্বনার জন্য লাগে নিজস্ব ভাষা। মায়ের ভাষা, মাতৃভাষার যে মধুরতা তা ভাষাতেই মেলে। তাই বলা হয়, ভাষা বলাতেই সুখ। কেউ না শেখালেও প্রয়োজনে পরিবেশ থেকেই আপনা-আপনিই মুখ হতে ভাষা বের হয়ে আসে। স্বত্বঃস্ফূর্ত ভাষায় দড়ি দিতে গিয়েই বিপাকে পড়েছিল পাকসরকার। বাঙালি রক্ত দিয়ে ভাষা তো প্রতিস্থাপন করল মুখে, সঙ্গে আদায় করল স্বাধিকার।
এখন ভাষা হয়ে উঠল শেখার, সৃজনশীলের, কারুকার্যের, শিল্পের। তাই প্রতিনিয়ত ভাষার শুদ্ধতায় মগ্ন ভাষাবিদগণ, কবি, সাহিত্যিক ও গবেষকগণ। ভাষার বৈশিষ্ট্য, স্বরূপ-প্রকৃতি, উদ্দেশ্য ও কার্যক্রম, ভাষার গুরুত্ব উপস্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে ভাষার পরিবর্তন সহজীকরণে কী প্রাণপণ চেষ্টা। ভাষায় নৈপুণ্য অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে চলতে থাকে ধ্বনি-বর্ণ, শব্দ, অর্থ বাক্যের ঋদ্ধ উপস্থাপন। অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, সংস্কৃত, পালি, মাগধি, প্রাকৃত, অপভ্রংশ―কত পথ ঘুরে হলো আজকের বাংলা। প্রাচীন যুগে ভারতবর্ষে আসে আর্যজাতি। তাদের ছিল বৈদিক ভাষা। পরে অনার্যদের ভাষার সঙ্গে আর্যভাষার মিশ্রণ ঘটে। বৈদিক আর অনার্য মৌখিক ভাষা মিলে তৈরি হয় প্রাকৃত ভাষা। প্রাকৃত ভাষাই আর্য-অনার্য জাতির প্রাণের ভাষারূপে পরিচিতি পায়। আর্য-অনার্য, অস্ট্রিক, দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি হলো বাংলা ভাষা। ভাষার স্থায়ী-রূপ হলো লিপি। আর সেই বাংলা লিপির উৎপত্তি হয়েছে ব্রাহ্মী লিপি থেকে। শুধু বাংলা নয়, ভারতীয় সকল লিপিই মৌলিক লিপি ব্রাহ্মী লিপির থেকে তৈরি হয়েছে। লিপিচর্চায় সৃষ্টি হয়েছে কতশত সাহিত্য। ইতিহাস থেকে জানা যায়, গুপ্তযুগ থেকে মুসলমান শাসনের পূর্ব পর্যন্ত বাংলায় সংস্কৃত, প্রাকৃত ও অপভ্রংশে সাহিত্যের চর্চা হতো। কালের বিবর্তনে প্রাকৃত ও অপভ্রংশ বিলুপ্ত হলেও সংস্কৃত ভাষা সাহিত্যচর্চা এ দেশে প্রবাহমান থাকে। হিন্দু শাসনামলে তথা পাল ও সেন যুগে বাংলাদেশে সংস্কৃত ভাষার ব্যবহার প্রাধান্য পায়। প্রাচীন বাংলার অর্থনৈতিক জীবন ছিল কৃষিনির্ভর। শিল্প, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও শিল্পকলার বিকাশ ঘটে এ যুগেই। বাংলাদেশের সঙ্গে বিদেশি বণিকদের গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি হয়। ফলে বিদেশি বিভিন্ন ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ ঘটতে থাকে। পৃথিবীর কোনো ভাষাই দিনক্ষণ দিয়ে উৎপত্তি হয় না। বহুযুগের বিবর্তনের ফল হলো ভাষা। বাংলা ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। অস্ট্রিক, দ্রাবিড়, আর্য, পালি, মাগধি ইত্যাদি ভাষার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছে। অস্ট্রিক বাংলার প্রাচীন ভাষা। সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষীর আদি অস্ট্রেলীয়।
বাংলা ভাষা ছিল। বাংলা ভাষা আছে এবং বাংলা ভাষা থাকবে। সেন শাসক বাংলা ভাষার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। ইংরেজ ও পাকিস্তান শাসক বাংলা ভাষার কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। পারবে না আগামী শত বছরেও কোনো শাসক, দেশ বা অন্য ভাষা। তবে ভাষা রূপ পরিবর্তন হবে নিশ্চয়ই।
বাংলায় ব্যবহৃত হয়েছে বহু ভাষা। এসব ভাষা থেকে বাংলা ভাষায় উৎস-স্থল বর্ণনাসহ ভাষার সহজপাঠের পদ্ধতি উপস্থাপন করা হয়েছে ভাষার সহজপাঠ গ্রন্থে।
গ্রন্থটির ভূমিকা লিখে দিয়ে চিরকৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন কবি, ব্যাকরণবিদ, ভাষাবিদ প্রাকৃতজ শামিমরুমি টিটন। আজ তিনি আমার খুব কাছের, বন্ধুবর, শ্রদ্ধার-ভালোবাসার। কিন্তু ৩৪ বছর পূর্বে তিনি ছিলেন আরাধনা। তাঁর ‘বাংলা টিটন গাইড (সাহিত্য)’ এবং ‘উচ্চতর ভাষা শিক্ষা’ ছিল আমার কাছে মহামূল্যবান পরশ পাথর। বই দুটি পড়ে স্কুল-কলেজে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছি। আজ আমার সাহিত্য, ব্যাকরণ ও নির্মিতিতে যে দক্ষতা তার সিংহভাব অবদান দুটি বইয়ের। সচেতনভাবে সাহিত্য এবং ব্যাকরণ ও নির্মিতিতে দক্ষতা অর্জনের হাতিয়ার ছিল গ্রন্থ দুটি। ভাষা-শিক্ষা পড়েনি এমন শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া যাবে না। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মানুষ হয়েছে, ব্যাকরণ শিখেছে গ্রন্থটি পড়ে। যে গ্রন্থ পড়ে আমি ভাষা-ব্যাকরণ-নির্মিতি শিখেছি সেই বইতে কাজ করার সুযোগও হয়েছে পরবর্তীসময়ে। আজ আমিও তাঁর প্রিয় মানুষ, তাঁর কাছের মানুষ। ভালোবাসা ব্যাকরণ গুরুর প্রতি।
গ্রন্থটি প্রকাশ করা জন্য ভাষাতরীর প্রকাশক লেখক বন্ধু উমর ফারুকের প্রতি কৃতজ্ঞ। বই তো ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। তাই ত্রুটি সংশোধনে প্রতিশ্রুতি রাখি।