দেশ ও জাতির এক চরম ক্রান্তিকালে, শ্বাসরুদ্ধকর এক জটিল ও অমীমাংসিত ইতিহাসের ক্ষমতার সাথে দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো, নিষ্ঠাবান সহকর্মীর মতো, নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন রাজনীতিবিদ আবদুল লতিফ জনি। সময়ের সাথে হয়ে ওঠেন ইতিহাসের সাক্ষী, ইতিহাসের অংশ অথবা নিজেও হয়ে ওঠেন ইতিহাস।
সে ইতিহাস বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের মুখপাত্র, গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমেদকে নিয়ে। স্বৈরাচারী আওয়ামী দুঃশাসনে পীড়িত বাংলাদেশে তখন বিএনপির নেতৃত্বে চলছে রাজনৈতিক আন্দোলন।
ফ্যাসিস্ট শাসকরা নীতি-নৈতিকতা, আইন-আদালত, ন্যায়, গণতন্ত্র কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে তাদের ক্যাডার বাহিনী। র্যাব, পুলিশ, প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সবগুলো প্রতিষ্ঠানই পরিণত হয়েছে ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবহ যন্ত্রতে। প্রতিদিন শত শত নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলা দিয়ে ঢোকানো হয়েছে জেলে। গুম, অপহরণ হচ্ছে নেতাকর্মীরা, ক্ষেত্রবিশেষে তাদের লাশটাও পাওয়া যাচ্ছে না। রাষ্ট্র পরিপূর্ণভাবে রূপ নিয়েছে নিপীড়কে, কোথাও কোনো জবাবদিহি নেই।
রক্ত হিম করা আতঙ্ক চারদিকে। ভয়ের এক নিষ্ঠুর সংস্কৃতির নিচে শাসকরা চাপা দিয়েছে জাতির সব অর্জন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। মানুষ ও মানবতা বলতে কোথাও কিছু নেই। সে রকম ভয়াবহ সময়ে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ হঠাৎ করে গুম হয়ে যান বিএনপির সে সময়কার মুখপাত্র সালাহ উদ্দিন আহমেদ।
শত চেষ্টা করেও তার পরিবার বা দল কেউই তার হদিস পাচ্ছিলেন না। সরকার নির্বিকার। পুলিশ নির্বিকার। আতঙ্কে অস্থির স্বজনরা। শঙ্কায় কাঁপছে মানুষ। দেড়-দুই মাসের মধ্যে তার আর কোনো খবর না পেয়ে সবাই ধরে নিয়েছিলেন জননেতা ইলিয়াস আলীর মতো, চৌধুরী আলমের মতো হয়তো সালাহ উদ্দিন আহমেদকেও আর ফিরে পাওয়া যাবে না।
সেই ভীষণ অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা আর শঙ্কার মধ্যে ১৩ মে ২০১৫ সালে ঢাকায় খবর আসে সালাহ উদ্দিন আহমেদকে ভারতের শিলং শহরে পাওয়া গেছে। ১১ মে মারাত্মক অসুস্থ ও উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় মেঘালয়ের পুলিশ তাকে উদ্ধার করেছে। কী করে তিনি শিলং গেলেন, কারা তাকে নিয়ে গেল, কীভাবে নিয়ে গেলোÑ এমন অজস্র প্রশ্ন তখন চারদিকে। তবু তিনি যে বেঁচে আছেন, এই সংবাদ রাজনৈতিক মহলে নিয়ে আসে একধরনের স্বস্তি।
খবরটি ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেখার জন্য, তার বিস্তারিত খবর জানার জন্য, তাকে আইনি সহায়তা দেওয়ার জন্য দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে যে মানুষটি সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে নিজের অসুস্থ শরীর নিয়েও শিলং ছুটে গিয়েছিলেন, তিনি আমাদের এই গ্রন্থের প্রণেতা আবদুল লতিফ জনি।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, সমস্যার পাহাড় সরিয়ে সরিয়ে, আইনের শত মারপ্যাঁচ অতিক্রম করে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বন্দি সালাহ উদ্দিন আহমেদের সাথে সাক্ষাৎ করতে পেরেছিলেন। নিশ্চিত করেছিলেন তার চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা লাভের পথ। গণমাধ্যমের মাধ্যমে তিনিই দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে জানিয়েছিলেন প্রকৃত পরিস্থিতি, সর্বশেষ অবস্থা। সালাহ উদ্দিন আহমেদের স্ত্রী ও স্বজনদের শিলং পৌঁছার পূর্ব পর্যন্ত তিনি একাই লড়েছেন যথার্থ নায়কের মতো। তার কাছে আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।
নিজের সেই রোমাঞ্চকর এবং রুদ্ধশ্বাস অভিজ্ঞতার নির্যাস নিয়েই লেখক সৃষ্টি করেছেন তার এই ‘শিলং অভিযান : সালাহ উদ্দিন আহমেদের সন্ধানে’ যেন দুর্গম গিরি কান্তার মরু অ্যাডভেনচারের মতোই এ গ্রন্থ আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ঘটনার দলিল, দুঃসময়ের দিনলিপি। অনিশ্চয়তা ও শঙ্কার সামনে রুখে দাঁড়ানো এক দৃঢ়চেতা যোদ্ধার প্রত্যয়।
আবার এ বইয়ে পাওয়া যাবে অচেনা ভুবনে ভ্রমণের স্বাদ। আবদুল লতিফ জনি দরদি মানুষ। তাই হয়তো প্রতিটি ঘটনাকেই যত্ন করে তুলে ধরেছেন গ্রন্থে। তাই সহজ ও সরল তার বলার ভঙ্গিটি সফরনামা প্রণয়নে যে দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন তার প্রথম গ্রন্থ ‘দজলা ফোরাতের দেশে’, সেই দক্ষতা যে আরও পরিণত হয়েছে, তার স্বাক্ষর তিনি এই গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন। এখন আমরা বলতেই পারি তিনি ‘রথ দেখা ও কলা বেচা’ দুটো কাজেই মুনশিয়ানা দেখাতে পারঙ্গম। এ গ্রন্থ তাই তো আমাদের কাছে দাবি করে বিশেষ মর্যাদা।
আমাদের প্রিয় সহযোদ্ধা, বন্ধু, রাজনৈতিক নেতা ও লেখক আবদুল লতিফ জনির এ বই পাঠকের মনোযোগ পাবে, এ আমার প্রত্যাশা।