মানবসভ্যতার অন্তঃসলিলা স্রোতে গল্প এক চিরপ্রবহমান অনুষঙ্গ। আদিম অগ্নিকুণ্ডের পাশে উচ্চারিত প্রথম বর্ণমালা থেকে আধুনিক নগরজীবনের নিঃসঙ্গ আলোকছায়া—প্রতিটি যুগেই মানুষ তার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা খুঁজেছে আখ্যানের ভেতর। গল্প কেবল বিনোদনের উপকরণ নয়; এটি স্মৃতির সংরক্ষণাগার, অনুভূতির অভিধান, আর আত্মপরিচয়ের গূঢ়তম অনুসন্ধান।ছোট গল্প সেই বিশাল আখ্যানভুবনের এক নিবিড় ও সংহত শিল্পরূপ। সীমিত পরিসরে অসীম জীবনবোধকে ধারণ করার যে নৈপুণ্য, তা একাধারে সূক্ষ্ম ও দার্শনিক। অল্প কয়েকটি চরিত্র, সামান্য ঘটনাপ্রবাহ, তবু তার অন্তর্লোকে উন্মোচিত হয় মানসিক টানাপোড়েন, নৈতিক দ্বন্দ্ব, সম্পর্কের জটিল ব্যুৎপত্তি এবং অস্তিত্বের অনিবার্য প্রশ্নাবলি। ক্ষুদ্রায়তন সত্ত্বেও ছোট গল্প প্রায়শই এক মহাকাব্যিক অনুরণন সৃষ্টি করে—নিঃশব্দ অথচ গভীর, সংযত অথচ সুদূরপ্রসারী।এই সংকলনের প্রতিটি আখ্যান জীবনবাস্তবতার বহুরৈখিক বিন্যাস থেকে সংগৃহীত। এখানে আছে নাগরিক ক্লান্তির নীরব প্রতিধ্বনি, গ্রামীণ সরলতার স্বচ্ছ অনুরাগ, সম্পর্কের অন্তর্গত ভঙ্গুরতা ও পুনর্গঠনের সম্ভাবনা, স্বপ্নভঙ্গের বিষাদ এবং পুনরারম্ভের প্রত্যয়। চরিত্রগুলো নিছক কাল্পনিক সত্তা নয়; তারা আমাদের চারপাশের মানুষদেরই প্রতিরূপ—কখনও উচ্চারিত, কখনও অনুচ্চারিত, কখনও বা চেতনার অন্তরাল থেকে উঁকি দেওয়া।এই গল্পগুলো রচনার প্রক্রিয়ায় আমি অন্বেষণ করেছি মানুষের অন্তর্গত আলোকবিন্দু—যে দীপ্তি দুঃসময়ের অন্ধকারেও সম্পূর্ণ নিবৃত্ত হয় না। ক্ষুদ্রতম মুহূর্তের মধ্যেও যে বিশাল তাৎপর্য নিহিত থাকে, দৈনন্দিনতার আবরণে যে গভীর দার্শনিকতা সুপ্ত থাকে, সেই অনাবিষ্কৃত স্তরগুলো উন্মোচনেরই একটি বিনম্র প্রয়াস এ গ্রন্থ।
পাঠকের প্রতি আমার নিবেদন—এই আখ্যানসমূহকে কেবল পাঠ্যরূপে গ্রহণ করবেন না; বরং আত্মসংশ্লিষ্ট এক অভিজ্ঞতা হিসেবে অনুভব করবেন। শব্দের অন্তর্নিহিত নীরবতাকে অনুধাবন করবেন, বাক্যের ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে থাকা অনুরণন শুনবেন। যদি কোনো চরিত্র আপনার চেতনার ভেতর দীর্ঘকাল প্রতিধ্বনিত হয়, যদি কোনো পঙ্ক্তি আপনাকে আত্মসমীক্ষার দিকে আহ্বান জানায়, তবে এই সাহিত্যিক উদ্যোগ সার্থকতা অর্জন করবে।শব্দের এই সংহত অথচ বহুমাত্রিক জগতে আপনাকে আমন্ত্রণ।
আখ্যানের অন্তরাল থেকে যে জীবনরস উৎসারিত হয়—তার সহযাত্রী হোন।