পৃথিবীর ভেতরকার কুয়াশা ও আলো—এই দ্বৈত শঙ্কা-সঙ্কোচ এবং সম্ভাবনার মধ্যেই জন্ম নেয় ভারসাম্য-নিয়ন্ত্রিত জগৎ। যেখানে অন্ধকার কখনো সম্পূর্ণ অন্ধকার নয়, আলোও নিখাদ উজ্জ্বলতায় স্থির থাকে না; বরং তাদের পারস্পরিক টানাপোড়েনেই তৈরি হয় বাঙ্ময় ভূখণ্ড। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ভূখণ্ড কখনও ভাষা-ভাগাড়ে নিক্ষিপ্ত হয়—ব্যবহৃত শব্দের স্তূপে চাপা পড়ে যায় তার দীপ্তি। আবার আশ্চর্যভাবে, সেখান থেকেই ভাষা পুনর্ব্যবহৃত হয়ে ফিরে আসে—নতুন প্রেক্ষিতে, নতুন ব্যঞ্জনায়, নতুন দায়ে। এই অনবরত রিসাইকেল হওয়া ভাষাই যেন দীর্ঘ ভ্রমণের আধিভৌতিক টুলস; যা গতায়াত করে অন্তর্জগৎ ও বহির্জগতের, নন্দন ও রাজনৈতিক বাস্তবতার, ব্যক্তিগত স্বপ্ন ও সামষ্টিক ইতিহাসের ভেতর দিয়ে।
এই ভ্রমণেরই এক অনুসন্ধিতসু পর্যটক কবি সিদ্দিক বকর। তাঁর কবিতার সিংকহোলে পাঠক ধীরে ধীরে নিমজ্জিত হবেন—সৃষ্টি ও সুন্দরের এক গভীর মায়াজাদুতে। যেখানে দৃশ্যগত আবরণ সরালেই ধরা পড়ে সময়ের গোপন রাজনীতি, ভাষার নীরব অভিসন্ধি, এবং মানবিক অভিজ্ঞতার সূক্ষ্ম কম্পন। শব্দ এবং সাউন্ড তাঁর কাছে নিছক প্রেক্ষাপট নয়; বরং সক্রিয় চরিত্র—যে নিজেকে উন্মোচন করে নতুন ব্যাখ্যায়, নতুন সম্পর্কসূত্রে। তিনি যা তুলে আনেন তা পাঠকের ব্যক্তিগত আবিষ্কারে রূপ নেয়—নিজস্ব পাঠভঙ্গিতে, নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোছায়ায়।
সিদ্দিক বকরের কবিতায় ভাষা কখনও স্থির নয়। শব্দেরা এখানে আত্মরাজনীতিতে ব্যস্ত, বাক্য গড়ে ওঠে আবার ভেঙে যায়, অর্থ জন্ম নেয় আবার প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়। তাঁর রিডিংরুমে প্রবেশ মানে এক ধরনের মানসিক অভিযাত্রা—যেখানে পাঠককে প্রস্তুত থাকতে হয় নিজের পূর্বধারণা ঝেড়ে ফেলতে। এই গ্রন্থ সেই প্রস্তুতিরই আহ্বায়ক।
একজন লেখক গ্রন্থের ভেতর কতখানি আত্মসেলাই করলে প্রকৃতি আরও প্রকৃত হয়ে ওঠে—কতখানি নিজেকে খুঁটিয়ে, ছিঁড়ে, আবার জুড়ে নিলে ভাষা নতুন প্রাণ পায়—সেই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজে পাওয়া যেতে পারে এই বইয়ে।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই পাঠকের। কারণ, এই ভ্রমণ বহুমুখী। তাই পড়ুন—আর নিজেই আবিষ্কার করুন সিদ্দিক বকরের এই অন্তর্মুখী ও বহুমাত্রিক যাত্রা, যেখানে কুয়াশা ও আলো মিলে নির্মাণ করে এক অনিবার্য জগৎ। এ জগতের সিংকহোলে আপনিও ফেঁসে যাবেন, হয়তো।