আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন নেতৃত্ব নিজেই এক গভীর সংকটে। নিজের দেশেই হোক, কিংবা বিশ্বরাজনীতির বিস্তৃত মানচিত্রে—প্রায় সর্বত্রই আমাদের মনে হচ্ছে, অযোগ্য, দায়িত্বজ্ঞানহীন, এবং নৈতিকভাবে অনির্ভরযোগ্য মানুষ ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসছে। শক্তিমান ব্যক্তিপূজা, কর্তৃত্ববাদ, এবং স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ক্রমশ শাসনব্যবস্থার ভেতরে জায়গা পাকা করছে। আর সাধারণ মানুষও ধীরে ধীরে হারাচ্ছে সেই আস্থা, যা তাদের আগামী দিনের প্রতি আশাবাদী রাখে। প্রশ্ন তাই জরুরি: আমরা এখানে এসে পৌঁছালাম কীভাবে? এবং তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এপথ থেকে ফিরে আসার উপায় কী?
গত এক দশক ধরে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কেনেডি স্কুল অব গভর্নমেন্টে এবং বিশ্বের নানা প্রান্তে শিক্ষার্থীদের সামনে ইতিহাসবিদ মোশিক টেমকিন একটি মৌলিক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে আসছেন। তাঁর বহুল জনপ্রিয় পাঠক্রম “Leaders and Leadership in History”–এ তিনি শিক্ষার্থীদের বাধ্য করেন নেতৃত্বের প্রকৃতি, সীমা, নৈতিকতা এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে। তাঁর নতুন গ্রন্থ Warriors, Rebels, and Saints–এ সেই শ্রেণিকক্ষের আলোচনাকেই তিনি আরও বৃহত্তর পাঠকসমাজের জন্য নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন।
চিত্রকলা, চলচ্চিত্র এবং সাহিত্যকে সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে টেমকিন অতীতের নাটকীয় মুহূর্তগুলোকে জীবন্ত করে তোলেন। তিনি অনুসন্ধান করেন, ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন ও সংকটপূর্ণ সময়ে নেতারা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—মহামন্দার ত্রিশের দশক থেকে শুরু করে রাফায়েল ত্রুহিয়োর স্বৈরতন্ত্র, বিশ শতকের উপনিবেশবিরোধী যুদ্ধ থেকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সংগ্রাম পর্যন্ত। তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্রে আছে শুধু এই প্রশ্ন নয় যে নেতারা কী করেছিলেন, বরং এই প্রশ্নও—তাদের সিদ্ধান্ত আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব?
এক অর্থে, বইটি কেবল অতীতের কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে বোঝার চেষ্টা নয়; এটি একই সঙ্গে একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক অনুশীলন। এমন এক পৃথিবীতে, যেখানে সুস্থ, দায়িত্বশীল, দূরদর্শী নেতৃত্বের চাহিদা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি, সেখানে টেমকিন আমাদের শেখাতে চান—নেতৃত্বকে অন্ধভাবে পূজা না করে, বরং ইতিহাসের আলোয়, সমালোচনামূলক বিচারবোধ দিয়ে, তার প্রকৃত মান নির্ণয় করতে। এবং সেই বিচার থেকেই হয়তো আমরা বর্তমানের জন্য শিক্ষা নিতে পারি, ভবিষ্যতের জন্য পথও খুঁজে পেতে পারি।