মাটি ও মানুষ একই সূত্রে গাঁথা। সৃষ্টির মূল উপাদান জল, যা থেকে পরবর্তীতে মাটির সৃষ্টি হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে নৌকায় চড়ে যাচ্ছিলেন তখন নদীর পাড়ে
কুমারদের শিল্পকর্ম দেখে বলেছিলেন, ‘সাধারণ মানুষের কর্মের মাধ্যমেই তিনি মুক্তির খোঁজ
পান- এই সাধারণ মানুষ আর কেউ নন- তারা কুমার বা মৃৎশিল্পী- যারা মাটি কেটে, মাটি মেখে
প্রতিদিন মাটির নান্দনিক শিল্পকর্ম তৈরি করেন। এই দেশের মানুষের মন যে শিল্পীর মন,
মৃৎশিল্প তারই পরিচয় বহন করে।’ মৃৎশিল্প আমাদের প্রাচীন সভ্যতার গৌরবময় নিদর্শন।
মাটি মাটিই থাকে, কিন্তু সঠিক কারিগরের হাতে তা সোনা হয়ে পরিপূর্ণতা পায়। পদ্মফুল
কাদামাটিতে জন্মায় তবুও চারপাশে থাকা ময়লা তার বৃদ্ধি বা সৌন্দর্যকে প্রভাবিত করতে পারে
না। প্রাকৃতিক নিয়মেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়, আবার বিলুপ্ত হয়ে
যায়। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির কিছু কিছু নিদর্শন এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে, কিছু আবার
রয়েছে বিলুপ্তির পথে। বাঙালির জীবন থেকে এই শিল্প কখনো একেবারে মুছে যাবে না।
থাকবে কালের সাক্ষী হয়ে। থাকবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিতে।
গড়াই সভ্যতার পাড়ঘেঁষে একসময় গড়ে উঠেছিল বৈচিত্র্যময় কারুশিল্পীদের শিল্পকর্ম
কুষ্টিয়ার মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্প যে কত প্রাচীন তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলা সাহিত্যের আদি
নিদর্শন চর্যাপদ থেকে। শিল্পের বিশাল সমুদ্রে শিল্পী এক একটা ঢেউয়ের মতো। সেই আদিকাল
থেকে খেলাচ্ছলে শিশুরা মাটিতে দাগ কাটে। সেই থেকে শিল্পের শুরু।
কুষ্টিয়ার মৃৎশিল্প শুধুমাত্র মাটির পাত্র নয়; এটা মাটি আর মানুষের চিরন্তন সম্পর্কের জীবন্ত
প্রতীক। মৃৎশিল্প একটি পেশা নয়, এটি বাংলার হৃদয়ের প্রতিধ্বনি- যেখানে মাটির গন্ধ, শ্রমের
সৌরভ ও ঐতিহ্যের আবেগ মিশে আছে। আধুনিকতার ঢেউ যতই প্রবল হোক, যদি আমরা
শিল্পীদের সম্মান, সহায়তা ও সুযোগ দিই, তবে এই প্রাচীন শিল্প টিকে থাকবে, বাঁচিয়ে রাখবে
আমাদের সংস্কৃতির গর্ব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে। আমাদের আদি
ঐতিহ্য এই মৃৎশিল্পকে বাঁচাতে হলে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
সভ্যতার আদি নিদর্শন মৃৎশিল্প। মৃৎশিল্পের শিকড় যে লোকজীবনের গভীরে প্রোথিত তা বলাই
বাহুল্য। এ দেশের নদীতীরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য পালপাড়া। পালপাড়ার কুমাররাই একদিন
নদীতীরের মাটি দিয়ে মৃৎশিল্পের চাকা সক্রিয় করেছিলেন। সেই চাকা আজও ঘূর্ণায়মান।
মৃৎশিল্পের অতীত ঘেঁটে তথ্যানুসন্ধান করলে এর গভীরে খুঁজে পাওয়া যাবে কুমোরদের বেদনা
আর বঞ্চনার প্রতিচ্ছবি। বাঙালির জীবন থেকে এই শিল্প কখনো একেবারে মুছে যাবে না,
থাকবে কালের সাক্ষী হয়ে। থাকবে আমাদের লোকজ সংস্কৃতিতে। মৃৎশিল্প নিজেই তার
পরিচয় বহন করছে। সভ্যতার শেষের কথা যদি কোনো দিন লেখা হয়, হয়তো সেখানেও উঠে
আসবে এই মৃৎশিল্পের কাহিনি। পৃথিবীর বুক থেকে অনেক সভ্যতা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু
মৃৎশিল্প তার গৌরবের ইতিহাস প্রতিনিয়তই তুলে ধরছে আগত ও অনাগতদের সামনে।