আবু তাহের বেলাল। নব্বই দশকের উচ্চকিত অন্যতম প্রধান কবি। পরে তাঁর কবিত্বের সাথে যুক্ত হয়েছে গীতিকারের সমৃদ্ধ পালকও। দুটোতেই তিনি সমান সঞ্চারণশীল।
নব্বই দশকের প্রথমদিকের একজন শক্তিমান কবি হলেও ডিসেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়নি। এটা বড় আশ্চর্যের কথাই বটে। অন্তত এই সময়ের প্রেক্ষাপটে। অবশ্য আমি মনে করি, গ্রন্থ প্রকাশে অপেক্ষা করে তিনি একদিকে ভালোই করেছেন। এতে করে তাঁর এযাবৎ লেখা অজস্রতার ভেতর থেকে বাছাই করে পরিপুষ্ট ও পরিপক্ব কবিতা নির্বাচনের যথেষ্ট সময় পেয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়-কালের মধ্যে তাঁর চিন্তাজগতের অনেক বাঁক পরিবর্তন ঘটেছে। যেমন বিভিন্ন বাঁক পরিবর্তিত হয়েছে তেমনই সমৃদ্ধ ও সুপক্ব হয়ে উঠেছে তাঁর কাব্যজগৎও। ফলে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এখন যে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মায়াবী পালক' প্রকাশ পেতে যাচ্ছে, এর অন্তর্ভুক্ত কবিতাগুলি খুবই সুনির্বাচিত ও সুখপাঠ্য হয়ে উঠেছে।
পাণ্ডুলিপিটি আমি মনোযোগ সহকারে পাঠ করে বুঝলাম কবি আবু তাহের বেলাল প্রকৃত অর্থেই একজন পরিণত ও শক্তিশালী কবি হয়ে উঠেছেন। এটা সত্যিই শ্লাঘার বিষয়ও বটে। কবিতার পাশাপাশি গান রচনায়ও তিনি সমান দক্ষ। একজন ভালো কবিই হতে পারেন একজন সুনিপুণ গীতিকার। এর দৃষ্টান্ত বাংলাদেশেই রয়েছে। তিনি কবি ও গীতিকার হবার ফলে তাঁর কবিতাগুলি যেমন হয়ে উঠেছে বাস্তবধর্মী, শৈল্পিক, ছন্দবদ্ধ; তেমনই মায়াবী কোমল ও গীতলস্পর্শী। এছাড়া ছন্দ-মাত্রা অন্ত্যমিলের পরিকল্পিত সুনিপুণ ব্যবহার, ছন্দের নানামাত্রিক খেলা, আধুনিক ও অলঙ্কারমণ্ডিত অনিবার্য শব্দচয়ন 'মায়াবী পালক' কাব্যগ্রন্থকে স্বাতন্ত্র্যে ভাস্বর করেছে। যে কারণে কাব্যগ্রন্থটি পাঠকের কাছে বিশেষভাবে শ্রদ্ধার ও গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে বলে আশা করি।
আমি কবি আবু তাহের বেলালের যেমন সার্বিক সফল্য কামনা করি, তেমনই তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ 'মায়াবী পালক'-এর পাঠকপ্রিয়তা এবং বহুল প্রচারও প্রত্যাশা করি। আশা করি তিনি আমাদের আশা ও স্বপ্নজাগানিয়ার চারণভূমিতে কবিতার সফল চাষবাসে আরো বেশি করে আত্মনিয়োগ করবেন এবং মনোযোগী হবেন।
সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনীতে জন্ম ২৭ মার্চ ১৯৭০ সালে। সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা চুনকুঁড়ি নদীর গান শুনে শুনে কেটেছে তার শৈশব কৈশোর। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস পূর্ণতা পেয়েছে মেঘনার পারে নরসিংদীতে। তাঁর পিতা আবু বকর গাজী ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মা জহুরা খানম ছিলেন আদর্শ গৃহিণী। চার ভাইবোনের মধ্যে দ্বিতীয় কবি আবু তাহের বেলাল। শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মেধাবৃত্তিসহ স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়া নরসিংদীর জামেয়া কাসেমিয়া থেকে মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে প্রথম শ্রেণিতে কামিল উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবন থেকেই সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন আবু তাহের বেলাল। তিনি একাধারে বাংলাদেশ বেতারের তালিকাভুক্ত গীতিকার, উপস্থাপক ও স্ক্রীপ্ট রাইটার। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি শিক্ষকতাকে বেছে নেন। বিভিন্ন কলেজে বাংলা বিষয় অধ্যাপনা করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রারের গুরুদায়িত্ব পালন করছেন। সাহিত্যের বহুমাত্রিক ধারায় তার শক্তিশালী বিচরণ হলেও ছন্দোবোদ্ধা ও প্রশিক্ষক হিসেবে তার অবস্থান বর্তমান বাংলা সাহিত্যের গুটিকয়েকের মাঝে অন্যতম। গীতিকবি হিসেবে সমকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠকবিদের একজন তিনি। আশির দশকের শেষভাগ থেকে ৯০ দশক; আবু তাহের বেলাল গদ্য পদ্যের দুধারাতেই তুমুল লিখে গেছেন জাতীয় পত্রিকা ম্যাগাজিনগুলোতে। বর্তমানেও সেই ধারা চলমান। আবু তাহের বেলাল রচিত সহস্রাধিক দেশাত্মবোধক, হামদ, নাত ও ইসলামী গান কোটি কোটি মানুষের মুখে মুখে আলোড়িত। জুলুমের বিপরীতে প্রতিবাদী কাব্য ও গীতিকায় তিনি সবসময় সরব। তার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে অন্যতম... ▪️হাজার গানের মাঝে একটি গানও যদি ▪️ঈমানের পথে অবিচল থেকে ▪️একদিন কাফেলাতো বন্দরে ভিড়বেই ▪️পৃথিবীর হাজার কাজের ভিড়ে ▪️আলোকিত কাফেলার রাহবার যারা ▪️থামবে না শিবিরের এই পথ চলা ▪️ফজরের ক্ষণ গেলো পড়োনি নামাজ ▪️অ-তে অজু করে আমি নামাজ পড়তে যাই ▪️দ্রোহের বকুল ▪️বিকেলের সৈকতে ▪️ফেরেশতারা নিমেষহারা ▪️চাঁদের চেয়ে সুন্দর তুমি ▪️কত দূর ঐ মদীনার পথ ▪️বনের পশু চিনলো যারে চিনলো না হায় মানুষ তারে ▪️দূর আরবের মরুর বুকে ▪️রাসূলের সীমাহীন ভালোবাসা ছাড়া লেখালেখিতে বহু মাত্রিকতার অধিকারী কবি আবু তাহের বেলাল। ছাত্রজীবনে তাঁর প্রকাশ হয় প্রথম শিশুতোষ গ্রন্থ 'শিশুর মুখে ফুলের হাসি' (১৯৯২), ২য় শিশুতোষ গ্রন্থ 'আমার পড়া' (২০১৯) ‘গানচনার কলাকৌশল' (যৌথ) (২০২৬) এবং মায়াবী পালক' তাঁর একক প্রথম কাব্যগ্রন্থ। সাহিত্য সংস্কৃতির সংগঠক হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্রের সভাপতি, বাংলাদেশ সংগীত কেন্দ্রের সেক্রেটারি, কবিতা বাংলাদেশের সহসভাপতি ছাড়াও বিভিন্ন সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠনের উপদেষ্টা ও পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সহযোগিতা ও দায়িত্বপালন করছেন। শিক্ষাবিদ হিসেবে নরসিংদী জেলার শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। নরসিংদী জেলায় প্রাইভেট কলেজ প্রতিষ্ঠার পথিকৃৎ কবি আবু তাহের বেলাল নরসিংদীতে প্রতিষ্ঠা করেন একাধারে নরসিংদীর শ্রেষ্ঠ তিনটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান– নরসিংদী মডেল কলেজ ন্যাশনাল কলেজ অব এডুকেশন এবং নরসিংদী রেসিডেন্সিয়াল হাইস্কুল এন্ড হোমস্।