ভিন্নচোখের এইবার বিষয় ‘সমসাময়কি নিরীক্ষামূলক গল্প’। অ্যান্ট্রি প্রোজ বা
অগল্প বা বিকল্প গল্প থেকে অধুনান্তিক বা পুনরাধুনিক বা অধুনাবাদী বা পোস্ট
মর্ডান বা উত্তর-ঔপনিবেশিক যাই বলেন গল্পের একটামাত্র রেখায় ‘মানে’
ভেঙ্গে ফেলে যে চর্চা সব মহাসমাবেশ আসবে এই সংখ্যায়। এ সময়ে বাংলা
ভাষায় যারা গল্প লিখছেন- বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গে এবং সারা পৃথিবীতে,
তাদের মধ্যে যারা ভালো গল্প লিখছেন, লিখছেন নিরীক্ষাধর্মী, লিখছেন নতুন
দৃষ্টিভঙ্গী ও শৈলীতে, সভ্যতার মুখোস খুলতে খুলতে এগোন যেসব কলম
তাদের গল্প, সাক্ষাৎকার এবং প্রবন্ধ নিয়ে এই সংখ্যার আয়োজন।
গল্পকে আমরা এতদিন অভ্যাসের মতো পড়েছি। শুরু, চরিত্র, সংকট,
পরিণতি—এই পরিচিত কাঠামোর ভেতর দিয়ে বাস্তবকে ব্যাখ্যা করার এক
নিরাপদ পদ্ধতি। কিন্তু বাস্তব আজ আর সেই নিরাপদ কাঠামোর ভেতরে
থাকে না। আমাদের সময় ভেঙে গেছে, স্মৃতি খণ্ডিত, পরিচয় অস্থির, আর
ভাষা নিজেই অনিশ্চিত। এই অবস্থায় গল্প যদি আগের মতোই থাকে, তবে তা
কেবল পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়ায়।
নিরীক্ষণ গল্প সেই পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক অস্বস্তিকর প্রচেষ্টা।
এই সংখ্যায় আমরা এমন গল্পগুলোকে একত্র করেছি, যেগুলো শুধু কী ঘটছে
তা বলতে চায় না, বরং কীভাবে বলা হচ্ছে—সেটাকেও প্রশ্ন করে। এখানে গল্প
তার নিজের গায়ে হাত দেয়, নিজের বয়ানকে সন্দেহ করে, নিজের
বাস্তবতাকে ভেঙে ফেলে নতুনভাবে গড়ে তুলতে চায়। চরিত্ররা অনেক সময়
পূর্ণ মানুষ নয়—তারা ভাঙা কণ্ঠ, স্মৃতির টুকরো, বা কোনো রাজনৈতিক ট্রমার
ছায়া হয়ে আসে। প্লট কখনো এগোয়, কখনো থেমে থাকে, কখনো আবার
নিজেকেই অস্বীকার করে।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে অভিজ্ঞতা আর সরল নয়।
ইতিহাস, মিডিয়া, রাষ্ট্র, ধর্ম, স্মৃতি—সবকিছু মিলে বাস্তবকে এমনভাবে গঠন
করে যে তাকে সরল গল্পে ধরলে সে মিথ্যে হয়ে যায়। নিরীক্ষণ গল্প সেই
মিথ্যার আরাম ভাঙতে চায়। এটা পাঠককে আরাম দেয় না; বরং তাকে তার
নিজের পড়ার অভ্যাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে অভিজ্ঞতা আর সরল নয়।
ইতিহাস, মিডিয়া, রাষ্ট্র, ধর্ম, স্মৃতি—সবকিছু মিলে বাস্তবকে এমনভাবে গঠন
করে যে তাকে সরল গল্পে ধরলে সে মিথ্যে হয়ে যায়। নিরীক্ষণ গল্প সেই
মিথ্যার আরাম ভাঙতে চায়। এটা পাঠককে আরাম দেয় না; বরং তাকে তার
নিজের পড়ার অভ্যাসের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
ভিন্নচোখের কাছে নিরীক্ষা কোনো ফ্যাশন নয়। এটা বেঁচে থাকার কৌশল।
যখন পরিচিত ভাষা আর যথেষ্ট নয়, তখন ভাষাকে ভাঙতেই হয়। যখন
পরিচিত গল্প বাস্তবকে ঢেকে দেয়, তখন গল্পের কাঠামোকে প্রশ্ন করতেই হয়।
এই সংখ্যার লেখকরা ঠিক সেই ঝুঁকিটাই নিয়েছেন—তারা গল্পকে নিরাপদ
জায়গা থেকে টেনে এনে অচেনা, অনিরাপদ, কিন্তু সত্যের কাছাকাছি এক
অঞ্চলে দাঁড় করিয়েছেন।
আমাদের এখানে সভ্যতার বিকাশ হইতেছিল ভার্বাল ফর্মে, কথ্য সভ্যতা।
আর কথ্য সভ্যতা মানেই হচ্ছে শ্রুতির ও কথনের নিরন্তর পরিধি, নিরন্তর
উৎঘাটন, আপনি নবীজির জীবনী একশ একবার সৃজন করতে পারবেন,
দ্বীনের নবী মোস্তফায় রাস্তা দিয়া হাইটা যায়...। অর্থাৎ কথ্য সভ্যতাটা
মানুষের স্মৃতি, শ্রুতি এবং সৃজনসমূহের একটা বিরাট স্পেকট্রামের মধ্যে কাজ
করে। উপনিবেশ আসার পর সেই কথ্য সভ্যতাকে উৎখাত করে লেখ্য
সভ্যতাকে কলোনাইজ করা হইছে, দার্শনিকভাবে এই অঞ্চলের জ্ঞানপ্রবাহকে
নস্যাৎ করা হইছে, সেটা শ্রুতি হোক, স্মৃতি হোক, সৃজন হোক, নিরন্তর রচনা
হোক, আর নিরন্তর দর্শনচর্চা হোক, যেটাই হোক সেইটাকেই ‘অপেশাদার’,
‘পিছিয়ে পড়া’, ‘দুর্বলতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হইছে। আপনার আমার
সামর্থ্যটাই, একটা জনপদের মানুষের সামর্থ্যটাই আপনি আমি বিশ্বাস করতে
শুরু করলাম দুর্বলতা হিসেবে, ভাবা যায়?
আমাদের দেশের পালাগানে বা লোকগল্পে চিন্তার ক্রিটিক সবসময় ছিল।
অনেক দেরিতে সেই জাদুবাস্তবতা আমরা আবিষ্কার করেছি। এই লোকগল্পের
স্থিতিস্থাপকতা বা গ্রহণযোগ্যতার ক্ষমতা অসাধারণ। সময় বিভাজনের
বিষয়টির যেমন, লোকগল্পে সময়কে একবারেই মূল্য দেওয়া হচ্ছে না। কারণ
তারও আগে ধ্রুপদী যুগে সময় ছিল অনন্ত। এখন সময়ের বৃত্তটা হয়ে গেছে
ঘড়ির কাটার বৃত্ত। সময়কে আমরা সংকীর্ণ করে ফেলেছি। কিন্তু আমি যদি
পুরনো দিনে চলে যাই, তাহলে কিন্তু সময়টাকে আমি অসম্ভব স্থিতিস্থাপক
হিসেবে পাবো। সে জন্য যারা সময়পীড়িত, যারা পরিসরের চিন্তায় ব্যতিব্যস্ত,
তাদের জন্য জাদুবাস্তবতা অনেকগুলো বিকল্প দরজা খুলে দিয়েছে। বাংলা
লোকগল্পে জাদুবাস্তবতা (magical realism) কোনো বিদেশি ধারণা
নয়—এটা আমাদের গ্রামবাংলার কল্পনা, বিশ্বাস আর দৈনন্দিনতার ভিতরেই
জন্মেছে। কয়েকটি শক্ত উদাহরণ দিচ্ছি:
ঠাকুরমার ঝুলি-তে রাক্ষসী আছে, কথা বলা গাছ আছে, মানুষ পাখি হয়, মৃত
ফিরে আসে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়— গল্প কখনো বলে না “এটা
অলৌকিক”। সবকিছু বলা হয় খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে—“রাক্ষসী এসে
মেয়েটাকে ধরল।” “সে গাছ হয়ে গেল।” “রাজপুত্র পাখি হয়ে উড়ে গেল।”
রোকেয়ার Sultana’s Dream- পুরোটা একটা স্বপ্নের ভিতর ঘটে। কিন্তু
লেখা এমনভাবে— যেন এটাই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম। পুরুষেরা ঘরে বন্দি,
নারীরা বিজ্ঞানী, আকাশে উড়ন্ত যান— কিন্তু কোনো ব্যাখ্যা নেই। না বলা হয়:
“এটা কল্পনা”, না বলা হয়: “এটা ইউটোপিয়া”, সব বলা হয়: এটাই জীবন।
মীর মশাররফ হোসেন বিষাদসিন্ধু-তে কারবালার ইতিহাস লিখছেন। কিন্তু
কীভাবে? ইমাম হুসাইন শহীদ হওয়ার পরও তিনি কথা বলেন, স্বপ্নে আসেন,
মাতার সঙ্গে সংলাপ চলে। কারবালা এখানে শুধু ইতিহাস নয়, একটি চলমান
অনুভূতি। মৃতরা মৃত নয়, তারা চেতনার ভেতরে জীবিত।
এগুলো রূপক না— লোকগল্পে এগুলো literal reality। লোকেরা বলে না:
“এটা অসম্ভব”— তারা বলে: “হ্যাঁ, এমনই তো হয়।” অলৌকিক ঘটনাকে
আলাদা করে বিস্ময় বলা হয় না। তা দৈনন্দিন জীবনের অংশ। এটা গার্সিয়া
মার্কেজের আগেও বাংলায় ছিল— গ্রাম, বিশ্বাস, গান, মৃত্যু ও প্রেমের ভিতর
দিয়ে।
জাদুবাস্তবতার অনুষঙ্গগুলো আমাদের জীবনেই আছে। যদি চর্চায় নিয়ে
আসতে পারি দাদা-দাদী নানা-নানীর সেই গল্পগুলো, তাহলে কিন্তু একটা
মজার সাহিত্য পাঠক পাইতে হতে পারে। অনেকগুলি সংকেত-চিহৃ নিয়ে
আমরা কাজ করতে পারবো। পণ্য সভ্যতার বিরুদ্ধে, ক্ষমতার বিরুদ্ধে কথা
বলার জন্য প্রতীকের সাহায্য বা বুদ্ধিদীপ্ত পণ্যগ্রাফি বা ভাষার কারুকাজের
আশ্রয় নিতে হবে না।
এই সংখ্যার পাঠককে আমরা তাই কোনো সমাপ্তি দিতে চাই না। আমরা চাই
পাঠক এই গল্পগুলো পড়ে কিছুক্ষণ অস্বস্তিতে থাকুক—নিজের স্মৃতি, নিজের
বাস্তব, নিজের ভাষা নিয়ে নতুন করে ভাবুক। কারণ সাহিত্যের কাজ শেষ
পর্যন্ত আমাদের আরাম দেওয়া নয়; আমাদের চোখ খুলে দেওয়া। ভিন্নচোখ
সেই চোখ খোলার জায়গাটুকুই ধরে রাখতে চায়। আর এই নিরীক্ষণ
গল্পগুলো সেই চেষ্টারই অংশ।