মতলুব আলী জীবদ্দশাতেই তাঁর বাছাই বারো রচনার পাণ্ডুলিপি আমাকে দিয়েছিলেন। যে লেখাগুলো তাঁর মননযাত্রার সারসংক্ষেপ- সময়সচেতন এক চিন্তকের আত্মআলাপ। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও সুকান্ত- এই কবিত্রয়ীর মানবতাবোধ ও জীবনবাদী উচ্চারণ থেকে শুরু করে একাত্তরের দিনলিপিতে রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গবন্ধুর প্রাসঙ্গিকতা; প্রগতিশীল চেতনার বিদ্রোহী উচ্চারণ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শিল্পদর্শন, গণসঙ্গীতের ঐকতান, বাংলাদেশের শিল্পকলার ঐতিহ্য ও আধুনিকতার দ্বন্দ্ব, লোকঐতিহ্যের ছান্দসিক কীর্তনিয়া, হতাশা ও আশার সময়চিত্র, খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরির স্মৃতির আবেগ এবং আহমদ রফিকের শিল্পবিশ্লেষণ- এই বারো রচনায় তিনি স্পর্শ করেছেন আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ এবং সামগ্রিক জাতিসত্তার গুরুত্বপূর্ণ বহু পরত।
মতলুব আলীর বাছাই বারো রচনা বইটি প্রকাশের দায় তো থেকেই যায় তাঁর অবর্তমানে। তবে সময়ের এমন এক খরতাপে এটি প্রকাশিত হলো, যা মুক্তচিন্তকের জন্য করা কঠিন কাজ। বিশেষ করে তাঁর পরিবারের তাগিদ ও অনুমতিক্রমেই সাহসী কাজটি সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত এটাই প্রথম বই। তাই প্রতিটি পৃষ্ঠা আজ স্মৃতির আবরণে আবদ্ধ, একই সঙ্গে দায়বদ্ধতারও সাক্ষ্য। তিনি নেই; কিন্তু তাঁর চিন্তা, তাঁর বিশ্লেষণ, তাঁর সংস্কৃতিসচেতন দৃষ্টিভঙ্গি- এসবই মানুষের জন্য, মানুষের মাঝে রয়ে গেল, তাঁর লেখা ও চিত্রশিল্পের মাধ্যমে।
মতলুব আলীর এই সংকলন প্রকাশ সম্ভব হয়েছে মূলত তাঁর সহধর্মিণী রেহানা সুলতানার তাগিদে। তাঁর মৃত্যুর পর তিনিই প্রথম আমার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন এবং বইটি প্রকাশে তাগাদা ও সহযোগিতার হাত বাড়ান। এমন গুণী সঙ্গী খুব কম লেখকের ভাগ্যে জোটে।
মতলুব আলীর জন্ম ১৩৫৩ বঙ্গাব্দের ৪ বৈশাখ (১৭ এপ্রিল ১৯৪৬), বৃহত্তর রংপুর জেলার মুুনশীপাড়ায় (বর্তমানে ‘স্বপনীড়’, আখতার সরণি), সাহিত্যিক ও সমাজসেবক অধুনালূপ্ত ‘খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী’র প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ খেরাজ আলী ও সাজেদা খাতুনের ঘরে। শিক্ষা: রংপুর জিলা স্কুল (মাধ্যমিক ১৯৬৩), কারমাইকেল কলেজ (১৯৬৪), চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় (ঢা.বি. ¯œাতক ১৯৬৯), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা ইনস্টিটিউট (¯œাতকোত্তর ১৯৮৭)। ১৯৭০-এ কর্মজীবনের সূচনা স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘ডেইলি পিপুল’ ও ‘সাপ্তাহিক গণবাংলা’য়। একাত্তরের ২৪ মার্চ ‘গণবাংলা’য় প্রকাশিত হয় ইয়াহিয়া-ভুট্টো চক্রকে বিদ্রæপ করে আঁকা ব্যঙ্গচিত্র ‘ডেইলি পিপুল’এÑ যা পরে হানাদার পাক-সরকার তাদের শ্বেতপত্রে প্রকাশ করে। প্রথম শিক্ষকতায় যোগদান ড্রইং মাস্টার হিসেবে ঢাকার আর্মানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে একাত্তর সনে এবং ১৯৭৩-এ চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে প্রভাষক পদে যোগদান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চারুকলা অনুষদ থেকে অধ্যাপক পদে অবসর গ্রহণ ২০১৩তে (অনুষদের ডিন হিসেবে নিয়োজিত ২০১০ থেকে ২০১২)। বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত লেখক, গীতিকার ও নাট্যকার; গণসঙ্গীত রচয়িতা ও সুরকার; শিল্প-সমালোচক, প্রাবন্ধিক ও গল্প-গ্রন্থ প্রণেতা; সাংস্কৃতিক সংগঠক ও জয়নুল আবেদিন বিষয়ক গবেষণায় সংশ্লিষ্ট ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর চিত্রশিল্পের ধারা-বৈশিষ্ট্যগত সুনির্দিষ্ট নামকরণের একমাত্র প্রস্তাবক।
উল্লেখযোগ্য বই: ‘আমাদের জয়নুল’ (অগ্রণী ব্যাংক শিশু সাহিত্য পুরস্কার); ‘জয়নুলের জলরঙ’ (বাংলা একাডেমি প্রকাশিত গবেষণা-গ্রন্থ) [জয়নুল গবেষক হিসেবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন স্মৃতিপরিষদ সম্মাননা (২০০৪)]; “আন্তঃবেতার শ্রæতি নাট্যোৎসবÑ’৯৬” প্রতিযোগিতায় অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে পুরস্কৃত।
গত ৪ নভেম্বর ২০২৫খ্রি. তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চায় তিনি ছিলেন আমরণ নিবেদিত।