বাংলাদেশের অগ্নিদিনের স্মৃতিজাগানিয়া এ এক উপন্যাস। ইতিহাসের নির্মম এবং নির্মোহ চাবুক কয়েকজন মানুষের জীবনকে কী ভাবে ক্ষত-বিক্ষত করতে পারে তারই একটি খণ্ডচিত্র এঁকেছেন আহমদ বশীর।
১৯৭১ সালে অদৃশ্য এক সুতোর মিলনে চরিত্রগুলো যখন পুতুলনাচের উপজীব্য, শহর ঢাকার এক কোণে একজন সদ্য তরুণ কলেজের ছাত্র দুচোখ মেলে দেখছিলো ভাঙনের আশীর্বাদ। যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই তাকে বিদেশে পালিয়ে যেতে হলো। আবার নব্বইয়ের দশকে দেশে এসে তাকেই দিতে হলো বাস্তবতার করুণ এক স্বীকারোক্তি।
তার মনে পড়ল... এই কাহিনিতো শুধু একাত্তরে শুরু হয়নি। ১৯৪৭ সালে সিলেটের করিমগঞ্জে কিছু মানুষের আর্তনাদকে বুকে নিয়ে একজন কি আসেনি ঢাকা শহরে? তারও মুক্তিযুদ্ধ ছিল। বাংলাদেশের মানুষ তখন অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, ইতিহাসের পৃষ্ঠা ওল্টাবার সময়... শহর থেকে পালিয়ে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে তৈরি হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধারা। আবার কেউ বা পাকিস্তানি ঘাতকচক্রকে মেনে নিচ্ছে... স্বেচ্ছায়... অনেকে বাধ্য হয়ে। তাদেরও মুক্তিযুদ্ধ ছিল। মনে পড়ে যায় একাত্তরের প্রথম প্রহরে ঢাকা স্টেডিয়ামে ইংল্যান্ডের সাথে পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলা। সেই সময় পাকিস্তানের স্বৈরাচারী প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করতে চায় বাংলাদেশের মানুষের গণদাবি। যে দর্শক উৎফুল্ল হয়ে খেলা দেখছিল, তারাই তখন ক্রীড়াক্ষেত্র লন্ডভন্ড করে জাগিয়ে তোলে বিশাল মিছিল। তাদের তো মুক্তিযুদ্ধ আছে। মনে পড়ে যায়, গোলার আঘাতে বিপর্যস্ত নয়াবাজারের নৌকার তোরণÑ পাশে বংশালের হোটেল সাইনু পালোয়ানের সাইনবোর্ড, তারপর একটা পুরোনো দোতলা বাড়ি- নাম তার তিথিডোর। সেই বাড়ির মেয়েটা, ঘোড়ার গাড়িতে করে তার যেতে হতো কামরুননেসা স্কুলে, তারও তো মুক্তিযুদ্ধ ছিল? কেন তাকে দাঁড়িয়ে থকতে হলো বুড়িগঙ্গা নদীর ধারে? মেনে নিতে হলো এত বড়ো বিচ্ছেদ।
এত আগুন, এত প্রেম, আর এত বিস্ফোরণের পর কি হারিয়ে যাবে একটি শব্দ, একটি নিনাদÑ বাংলাদেশের জয়।
আহমদ বশীরের প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্য পটভূমি প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে, যা হুমায়ুন কাদির সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল ১৯৮২-তে। তারপর আরো দুটো ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হলেও লেখক কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সাহিত্যজগৎ তেকে স্বেচ্ছা-নির্বাসনে চলে যান। হঠাৎ মৌনতা ভেঙে, কোনো এক মহাশক্তির কল্যাণে, আবার লেখালেখি শুরু করেছেন। রাহুচক্রের আহ্বানে আবার যদি কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যান এই লেখক, কারও বুঝি কিছু বলার থাকবে না সেই দিন।