কাছে পেয়েও পেল না নন্দিতাকে, যাকে তার জীবনসঙ্গিনী করবে বলে একদিন পশ্চিম আকাশের রক্তে রাঙা অস্তাচল রবিকে সাক্ষী রেখে শপথ করেছিল। বুকভরা কত যে আশা নিয়ে এসেছিল কিন্তু কী পেয়েছে? পেয়েছে শুধু একটা নিথর পাথরের মতো দেহ শুধু নেই তাতে শ্বাসপ্রশ্বাস।
হায়রে অভাগী! ভালোবাসার কি প্রতিদান! হৃদয় মাঝে কত যে আশা ছিল নন্দিতার, আজ সকল আশা “তাসের ঘরের” ন্যায় ভেঙে গেল। হাউমাউ করে কেঁদে কেঁদে নন্দিতা বলল, ‘ওগো প্রিয়তম, ওগো প্রাণপ্রিয় বন্ধু আমার, তুমি একটিবার তোমার নয়নযুগল মেলে তাকিয়ে দেখো আমি তোমার নন্দিতা তোমারই দ্বারে। তুমি একটিবার আমার দিকে চেয়ে দেখো। আমি তোমার জীবনসঙ্গিনী হব বলে বাড়ি থেকে চিরদিনের মতো ঘর ছেড়ে এসেছি তোমার কাছে। ওগো অভাগী বন্ধু আমার তুমি চলে যেও না একটু কথা বলো— একটু কথা বলো।’
আর কথা বলবে না প্রিয়তম, সে যে জনমের মতো চলে গেছে শুধু রেখে গেছে কিছু স্মৃতি। এ পৃথিবীর কোথাও খুঁজলে আর তাকে পাওয়া যাবে না। পাগলপ্রায় নন্দিতা, নির্বাক হয়ে গেছে। কোথায় যাবে এখন। না-কি বাবার কাছে না অন্য কোথাও। বাবাকে না বলে চলে এসেছে আবার বাড়ি ফিরে গেলে বাবা কী তাকে সহজে মেনে নিবে তাছাড়া পাড়া প্রতিবেশীরাও কী বলবে? এ সকল ভাবতে ভাবতে আকাশের বুকের উপরই ঘুমিয়ে পড়ল নন্দিতা।
চঞ্চলা প্রকৃতির মেয়ে নন্দিতা অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী কৈশোরে পদার্পণ চৌদ্দতে পা দিয়েছে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে নন্দিতা মেজো। যেমন লম্বা তেমনি স্বাস্থ্য, মায়াবী হরিণী আঁখিযুগল, লম্বা কেশরাজি তার, একবার দেখলে আর চেখ ফেরানো যায় না। অপরূপ সুন্দরী, সর্বাঙ্গে মনে হয় কে যেন কাচা হলুদ মেখে দিয়েছে। একবার দেখলে মনে হয় স্বর্গের অপ্সরী। সৃষ্টিকর্তা কোনো এক ব্যক্তির জন্য নিজ হাতে গড়িয়েছেন হয়তোবা।
নন্দিতার মামার বাড়ি নিজ বাড়ি হতে খুব বেশি একটা দূরে নয়। পায়ে হেঁটে যেতে পয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগে অর্থাৎ বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার বড়ো আন্ধার মানিক গ্রাম। বড়ো মামার বিবাহ হয়েছে মাত্র চার পাঁচ দিন। নতুন মাসি ঘরে আসছে কত না আনন্দ। নন্দিতার একার পক্ষে যেন এত আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব নয় তাই ভাবছে আরো দু-চার জন হলে ভালোই হতো। মামার বিয়ের আনন্দে এবাড়ি-ওবাড়ি খুব মজা করে বেড়ানো যেত। হিন্দু মতে মেয়েদের বিবাহ হলে দ্বিতীয়বার শ্বশুরবাড়ি থেকে জোড় ভেঙে বাবার বাড়িতে আনতে হয়। তাই নন্দিতার মাসির বেলাও একই ঘটনা ঘটল। মাসির বাবার বাড়ি থেকে প্রায় পনেরো জন অতিথি এসেছে তার মধ্যে মেয়েরাও ছিল আর দুজন অল্প বয়সি ছেলেও ছিল। আকাশই তাদের মধ্যে একজন অন্যজন মাসির ঘনিষ্ঠ, আকাশ একটু দূরে আত্মীয়। অতিথিদের পেয়ে নন্দিতা খুব খুশি। সারাদিন শুধু তাদের সাথে গল্প করাই যেন নন্দিতার একমাত্র কাজ।