এই বই কোনো নিরাপদ কবিতার সংকলন নয়।
এ বই ক্ষমতার আরামের ভাষায় কথা বলে না।
এখানে শব্দ নিরীহ সৌন্দর্যের অলংকার হয়ে থাকে না; শব্দ দাঁড়ায় রাষ্ট্রের মুখোমুখি। প্রশ্ন তোলে—ক্ষমতা কার? ইতিহাস কার? আর যেসব নামহীন লাশ রাজপথে পড়ে থাকে, তারা কারা?
এই কবিতাগুলো জন্ম নিয়েছে সময়ের ক্ষতচিহ্ন থেকে। একটি দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস যখন মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের ভেতরে ঢুকে পড়ে, যখন ক্ষমতার নাম উচ্চারণ করাই ঝুঁকির নামান্তর হয়, যখন মত প্রকাশ মানেই নজরদারির তালিকায় উঠে যাওয়া—তখন কবিতাও আর নিছক সৌন্দর্যের অনুশীলন থাকে না। তখন কবিতা হয়ে ওঠে সাক্ষ্য, হয়ে ওঠে প্রতিবাদ, কখনো কখনো হয়ে ওঠে প্রার্থনা- যাতে শব্দের ভেতর দিয়েই মানুষ নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে।
অপরাজেয় বেগম খালেদা জিয়া ও তরুণ শ্রেণির প্রাণন রাষ্ট্রনায়ক তারেক রহমান—এই নামগুলো এই বইয়ে কেবল ব্যক্তি নয়। নাম দুটো উচ্চারিত হলেই একটি যুগ দাঁড়িয়ে যায় আমাদের সামনে—তার ক্ষত, তার বিভাজন, তার দীর্ঘশ্বাসসহ। এরা একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সময়ের প্রতীক, যেখানে বিরোধ মানেই দমন, ভিন্নমত মানেই রাষ্ট্রীয় সন্দেহের তালিকাভুক্ত হওয়া। এই কবিতাগুলো ব্যক্তি-নির্ভর বন্দনায় আটকে নেই; এগুলো ক্ষমতার কাঠামোকে প্রশ্ন করে, আইনের নামে অবিচারকে চিহ্নিত করে, আর রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্বিকার নিষ্ঠুরতার সামনে মানুষের মুখ ফিরিয়ে দেয়। এই মুখ ফিরিয়ে নেওয়া পলায়ন নয়—এ এক নৈতিক প্রত্যাখ্যান, অন্যায়ের সঙ্গে আপস না করার নীরব ঘোষণা।
জুলাইয়ের উত্তাল দিনগুলো এই বইয়ের কোনো আলংকারিক পটভূমি নয়—এ বইয়ের রক্তস্রোত। রাজপথে তরুণদের যে আত্মত্যাগ, তা কোনো আকস্মিক বিস্ফোরণ নয়; তা দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও কণ্ঠরোধের জমে ওঠা ইতিহাসের স্বাভাবিক ফল। সেই দিনগুলোতে তরুণেরা যখন রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল, তারা জানত না ইতিহাসে তাদের নাম লেখা হবে কিনা—তারা জানত শুধু, আর চুপ করে থাকা যায় না। এই কবিতাগুলো সেই অচেনা মুখগুলোর জন্য, যাদের কবরের পাশে কোনো ক্যামেরা দাঁড়ায়নি, যাদের স্বপ্নগুলো অপূর্ণ থেকে গেছে। এখানে আছে মায়ের কান্না, বন্ধুর নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার স্তব্ধতা, আবার আছে এক অদ্ভুত মুক্তির উচ্ছ্বাস— যেন অন্ধকার যত গভীরই হোক, ভোর তার ঠিকানা ভুলে যায় না।
এই বইয়ে দ্রোহ আছে, কারণ ন্যায় নেই।
এই বইয়ে প্রতিবাদ আছে, কারণ বিচার নেই।
এই বইয়ে শোক আছে, কারণ লাশ গোনা হয়েছে।
তবু এই বই হতাশার স্তবগান নয়। কারণ কোনো রাষ্ট্রযন্ত্রই মানুষের স্বপ্নকে চিরদিন বন্দি রাখতে পারে না। মানুষের বুকের ভেতর এমন এক আলো থাকে, যা কখনো কখনো ক্ষুদ্র প্রদীপের মতো, কখনো দাবানলের মতো—কিন্তু নিভে যায় না। এই কবিতাগুলো সেই আলোকে শব্দে ধরার চেষ্টা।
“মুক্তির পারিজাত” কোনো নিরীহ প্রতীকের নাম নয়। এ ফুল ফুটেছে কারাগারের ভেতরে, ফুটেছে সেন্সরের কালো কালি ভেদ করে, ফুটেছে লাঠিচার্জের ধুলোয়, শহিদের রক্তেভেজা রাজপথে। এ ফুল রাষ্ট্রকে শোভা বাড়াতে নয়—এ ফুল রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে ছুড়ে মারা। এর পাপড়িতে রক্তের দাগ আছে, তবু তার গন্ধে আছে আগামী দিনের স্বপ্ন। এ ফুল বিজয়ের উল্লাসের ফুল নয়—এ এক আহত ফুল, যে আহত হয়েও সৌরভ ছড়াতে ভোলে না।
এই বই পড়া মানে কেবল কবিতা পড়া নয়।
এ বই পড়া মানে সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো।
নিজের ভেতরের ভয়, ক্লান্তি আর আপসের সঙ্গে হিসাব মেলানো।
নিরপেক্ষতার আরাম ভেঙে ফেলা। কারণ নিপীড়নের মুখে নীরবতা নিজেই একটি রাজনৈতিক পক্ষ। এই কবিতাগুলো কারো অন্ধ পক্ষপাত চায় না; এগুলো চায় মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস—মানুষের অধিকার, অপমানিত আত্মমর্যাদা আর অবরুদ্ধ ভবিষ্যতের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস।
যদি এই বইয়ের কোনো একটি কবিতা পাঠককে এক মুহূর্ত থামিয়ে দেয়, যদি মনে করিয়ে দেয়—এই দেশের রাজপথে নামহীন মানুষেরাও মানুষ, তাদেরও স্বপ্ন আছে, তাদেরও ক্ষত আছে—তাহলেই “মুক্তির পারিজাত” তার জন্মের দায় কিছুটা হলেও শোধ করবে। কারণ কবিতা শেষ পর্যন্ত শব্দের সৌন্দর্য নয়; কবিতা হলো মানুষ হয়ে থাকার এক নীরব অথচ দৃঢ় অঙ্গীকার।
আমার স্নেহানুজ কামরুজ্জামান, রোজালিন ও সাইফুলকে জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা—তাঁদের শ্রম, ধৈর্য আর ভালোবাসা ছাড়া এই বইটি আলোর মুখ দেখতে পেত না।
এই কবিতাগুলোর ভেতর দিয়ে যদি পাঠক হৃদয়ের কোথাও একটু আলো, একটু ব্যথা, কিংবা একটু সাহস খুঁজে পান—তবেই এই পরিশ্রম সার্থক হবে।