একজন মানবিক টিটি
দাকোপ উপজেলার কামারখোলা গ্রাম, সুন্দরবনের গা ঘেষা, পশ্চিম দিকে বহে গেছে খরস্রোতা শিবসা নদী, একেবারে সুন্দরবনের বুক চিরে পৌঁছে গেছে বঙ্গোপসাগরে। এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের জীবিকার উৎস সুন্দরবন, কেউ মাছ ও কাঁকড়া ধরে, কেউ মৌয়াল, কেউ গোলপাতা সংগ্রহ করে, কেউ কেউ কাঠ কাটে, সুযোগ বুঝে হরিণও শিকার করে, যখন গ্রামবাসী সুন্দরবনে যায় চেষ্টা করে দল বেঁধে যেতে, তবুও প্রতিবছর কেউ না কেউ বাঘের থাবায় আহত হয় বা প্রাণ হারায়, তাছাড়া বছরে হঠাৎ দুই একবার জঙ্গলের বাঘ লোকালয়ে হানা দেয়, এভাবেই চলে কামারখোলা ও আশেপাশের গ্রামের লোকজনের দৈনন্দিন জীবন।
কামারখোলা গ্রামের সনু মৌয়ালের চার ছেলের বড়ো তিন জনই জীবিকার তাগিদে বাবার সাথে বনে কাজ করে, প্রতিদিন সকাল হতেই সবাই শুকনো খাবারের পোটলা নিয়ে নৌকায় করে বের হয়ে যায়, মধু সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেলা শেষের পথে, ছোটো ছেলে রাশীকে (রাশীদুল হক) ওর মামা জোর করে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করে দেয়, রাশীর মাথা বেশ ভালো, সব ক্লাসে প্রথম হয়, ওর মামা সনু মৌয়ালকে বলেছে রাশীকে পড়তে দাও, আর তোমরা সবাই কাজ করো, দেখবে ও একদিন মস্ত অফিসার হবে।
রাশী গ্রামের স্কুল থেকে প্রাইমারি পাশের পর ওর মামা দাকোপ হাই স্কুলে ভর্তি করে দেয়, স্কুলের কাছাকাছি একটা লজিং এর ব্যবস্থাও করে, মামা মাঝেমাঝে খোঁজখবর নেয়, হঠাৎ হঠাৎ দুই চার টাকা হাত খরচ দেয়।
মাধ্যমিক পাশের পর মামা রাশীকে নিয়ে খুলনার বিএল কলেজে ভর্তি করে, রেজাল্ট ভালো থাকাতে সহজেই হোস্টেলে সিট পেয়ে যায়। টিউশনি আর নিজের পড়াশোনা সুষ্ঠুভাবেই চলতে থাকে, মাঝেমাঝে দূর সম্পর্কের চাচার বাড়িতে যেতে হয়, বিশেষ করে ছুটির দিনে, চাচা বলেছে মৌলীকে একটু পড়াটা দেখিয়ে দিতে। ধনবান চাচার বড়ো মেয়ে মৌলী, রাশীর সাথেই পড়ে, তবে মাথা একটু কম, সুন্দরী বলে পড়াশোনার চেয়ে সাজগোজে বেশি পারদর্শিনী।
রাশীর মনের মধ্যে ভালোলাগা থাকলেও ভালোবাসাবাসির কোন প্রকাশ নেই, তার লক্ষ্য ভালো রেজাল্ট করে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া, ভালো মানুষ হওয়া। রাশী ইন্টারে যথারীতি ভালো রেজাল্ট করে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়রিং ডিপার্টমেন্টে ভর্তি হলো, মৌলি ভর্তি হলো বিএল কলেজে অনার্সে। কদাচিৎ দুজনের দেখা হয়, রাশী পড়াশোনা ও টিউশনির ব্যস্ততায় চাচার বাসায় যেতে তেমন সময় পায় না।
ইঞ্জিনিয়রিং পাশের পর রাশী চাকরির জন্য ঢাকায় চলে আসে, অল্প কিছু দিনের মধ্যেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের কম্পিউটার বিভাগে চাকরিতে যোগ দেয়।
মৌলির ইচ্ছায় ও চাচা-চাচির অনুরোধে দুই পরিবারের সম্মতিতে রাশী-মৌলির অনাড়ম্বরভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়।
ফজলুর রহমান ট্রেনের টিটি, বত্রিশ বছরের চাকরির শেষ প্রান্তে, বসবাস খুলনায়, দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন অনেক আগেই, তিন ছেলেও চাকরি করে সংসার করছে, নাতি-পুতি নিয়ে এলাহি কারবার।
ফজলু টিটি সারাদেশেই চাকরি করেছেন, চাকরির প্রথম দিকে চট্টগ্রাম ছিলেন, তারপর সিলেট, এরপর বহুদিন পার্বতীপুর, ঈশ্বরদী, সৈয়দপুরে জীবন কেটেছে, শেষ বয়সে এসে নিজের এলাকায় পোস্টিং, সারা জীবন ট্রেনে ট্রেনে ঘুরেই কাটল। মাঝেমাঝে চিন্তা হয় অবসর সময় কেমনে কাটবে!
আজ বুধবার, ফজলু টিটির শেষ ডিউটি, সন্ধ্যা সাতটায় কমলাপুর স্টেশন থেকে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ছেড়ে যাবে খুলনার উদ্দেশে, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামীকাল সকাল সাড়ে ছয়টায় খুলনা স্টেশনে পৌঁছাবে।
মোট বারোটা বগি, দুই জন টিটি, সঙ্গে দুইজন সহকারী এবং আনসার আছে, ফজলুর রহমান দুপুরের পর থেকেই নিজেকে তৈরি করতে থাকেন, ড্রেস পরে কাঁচা পাকা দাড়িতে চিরুণীর পরশ দিয়ে একটু আতর লাগালেন।