বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ। এর সম্পদ খুবই সীমিত। এ সীমিত সম্পদ দিয়ে অসীম চাহিদা পূরণ করা একটি দূরহ কাজ। এ সীমিত সম্পদকে উৎপাদনশীল উপায়ে কাজে লাগিয়ে এর ব্যাপক চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। যে দেশ বা জাতি শিল্পে যত উন্নত সে দেশ তত অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত যদি শিল্পায়ন হয় তবে নিঃসন্দেহে শিল্পায়নের পূর্ব শর্ত হচ্ছে উৎপাদনশীলতা। অর্থাৎ সীমিত সম্পদ যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সস্তায় গুণগত পণ্য উৎপাদন অন্য কথায় উৎপাদনশীলতা হলো উন্নয়নের একমাত্র উপায়। উৎপাদনশীলতা বিষয়টি বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং সমাদৃত হলেও বাংলাদেশে এ বিষয়টি এখনও উপেক্ষিত। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ উৎপাদনশীলতা ও এর ধ্যান-ধারণা, চিন্তা-চেতনা কলা-কৌশল সম্বন্ধে তেমন সচেতন নয়। বিষয়টি সম্যক উপলব্ধি পূর্বক শিল্পাঙ্গনে উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের বিভিন্ন কলা-কৌশলের বাস্তব প্রয়োগের লক্ষ্যে আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস। ইংরেজিতে এ বিষয়ে যথেষ্ঠ পুস্তক-পুস্তিকা, প্রবন্ধ ইত্যাদি থাকলেও বাংলায় তেমন কোন বাস্তবধর্মী বই বা লেখা নেই। আশাকরি এ বইটি শিল্প কল-কারখানার মালিক, ব্যবস্থাপনা ও শ্রমিক কর্মচারী এবং সরকারকে উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন ভাবনায় খোরাক জোগাবে।
বইটিতে উৎপাদন, উৎপাদনশীলতা এর পরিমাপসহ উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের যাবতীয় কলাকৌশল, যেমন— কাইজান, ফাইভ এস, টি কিউ এম, জিরো ডিফেক্ট, জিরো ইনভেন্টরী, জাস্ট ইন টাইমসহ বিভিন্ন জাপানী কলা-কৌশল বাস্তবে প্রয়োগের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
বইখানি দেশের শিল্প কল-কারখানার উৎপাদনশীলতা উন্নয়ন এবং গবেষকদের গবেষণা কাজে ব্যবহৃত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক শিল্প ও বাণিজ্যিক বিশ্বে উৎপাদনশীলতা কেবল একটি অর্থনৈতিক পরিমাপক নয়, বরং এটি একটি প্রতিষ্ঠান, শিল্প এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। উৎপাদন- শীলতার সঠিক অর্থ ও সংজ্ঞা অনুধাবন, দক্ষতা ও ফলদায়কতার পার্থক্য নিরূপণ এবং উৎপাদনের সঙ্গে উৎপাদনশীলতার গভীর সম্পর্ক উপলব্ধি করা আজ সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এই গ্রন্থে উৎপাদনশীলতা পরিমাপের বিভিন্ন পদ্ধতি, উপাদান উৎপাদনশীলতা ও মোট উৎপাদনশীলতা নির্ণয়, সংযোজিত মূল্যের ভিত্তিতে উৎপাদনশীলতা বিশ্লেষণ এবং আন্তঃপ্রতিষ্ঠান উৎপাদনশীলতা তুলনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ সহজ ও বাস্তবভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন- শীলতা পরিমাপের মাধ্যমে উন্নয়ন সাধনের কৌশল এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়েছে।
গ্রন্থটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—মানুষকেন্দ্রিক ব্যবস্থাপনা। উৎপাদনশীলতা উন্নয়নে উপরস্থ কর্মকর্তা ও নিম্নপদস্থ কর্মচারী ও শ্রমিকদের সঙ্গে আচরণ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অংশগ্রহণমূলক মনোভাব এবং নেতৃত্বের ভূমিকার গুরুত্ব এখানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নতুন কর্মকর্তার ব্যর্থতার কারণসমূহ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দক্ষ নেতৃত্ব গঠনের বাস্তব দিকনির্দেশনাও প্রদান করা হয়েছে।
এছাড়াও আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি যেমন টোটাল কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট, কিউসি সার্কেল, অপচয় নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্য রক্ষা ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য-স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিশেষ বিধান এবং কল্যাণমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা উন্নয়নের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। শিল্প পরিচালনায় দক্ষ উদ্যোক্তা হওয়ার কলাকৌশল এই গ্রন্থকে আরও বাস্তবমুখী ও সময়োপযোগী করেছে।
আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই গ্রন্থটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক, কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা, প্রশিক্ষণার্থী, শিক্ষার্থী এবং উৎপাদনশীলতা উন্নয়নে আগ্রহী সকল পাঠকের জন্য একটি কার্যকর সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে টেকসই উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে এই বই পাঠকদের চিন্তা ও কর্মে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।