গৌতম ঘোষের জন্ম ১৯৫০ সালের ২৪ জুলাই। দেশভাগের কাঁটাছেড়ার বছর তিনেক পর। পিতার পূর্বপুরুষ তৎকালীন পূর্ববঙ্গের ফরিদপুরের বাসিন্দা। মায়ের পূর্বপুরুষের আদিভিটা বিক্রমপুর। এই বাংলাভাগ চিরস্থায়ী হতে পারে__ এই বাস্তবতা অবান্তর মনে হয়েছিল গৌতম ঘোষের দাদামশাইয়ের কাছে।
এই গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র অখণ্ড পৃথিবীর অভিন্ন মানুষের গল্প বলে এসেছে কালে-কালে।
বসুশ্রী সিনেমাহলে বাড়ি থেকে 'পথের পাঁচালী' দেখতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ছোট্ট গৌতমকে। গৌতম ঘোষের ভাষ্যমতে, ‘ট্রেনটা খুব ভালো লেগেছিল। কালো ধোঁয়া দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে... সেই কাশফুল। দুর্গার মৃত্যুর পর খুব কেঁদেছিলাম।’ 'The guns of Navarone' চলচ্চিত্রে গ্রেগরি পেক বৃষ্টিস্নাত রকের ওপর দড়ি দিয়ে উঠছে__ এই দৃশ্য তাঁর শিশুমনে ফেলল আশ্চর্য অভিঘাত। তারই প্রেরণায় প্রচণ্ড বৃষ্টির দিনে ছাদ থেকে কোনোরকমে একটা দড়ি নামিয়ে বেয়ে বেয়ে ওঠা-নামা করত সেই ছোট্ট গৌতম। এটা ছিল খেলা।
অকাল শৈশবেই একটা Kodak Brownie বক্স ক্যামেরা উপহার দিয়েছিলেন মামা। সেই ক্যামেরায় যত না ছবি তুলত, ভিউ ফাইন্ডার দিয়ে তারচেয়ে অনেক বেশি পৃথিবী দেখে বেড়াত গৌতম। সেই দেখা থেকে ফ্রেম, ফ্রেমে বন্দি দৃশ্য আর আলোক প্রক্ষেপনের নেশা পেয়ে বসে তাঁকে। কৈশোরে পাড়ার থিয়েটার গ্রুপে যোগ দিয়ে মাইম, ভয়েস থ্রোয়িং, ফিজিক্যাল অ্যাক্টিং শিখলেন। কিন্তু নিজে অভিনয় নয়, অভিনয় করানোয় পেলেন অদ্ভুত এক আনন্দ। এই আনন্দ নিয়ে করতে আরম্ভ করলেন অবাক সফর। গুটিকয় সিনেমায় অভিনয় করেও বুঝিয়ে দিলেন, ‘একেই বলে অ্যাক্টিং__’
তখন তাঁর সদ্যযৌবন। ’৭৪ সাল। কলকাতায় এল দুর্ভিক্ষ। হাতে তাঁর পুরনোদিনের হ্যান্ডওয়াইন্ড ক্যামেরা। ষোল মিলিমিটার ফিল্ম দিয়ে গ্রামেগঞ্জে, নগরে-বন্দরে, রেলস্টেশনে ঘুরে-ঘুরে তুললেন ছবি। নির্মাণ করলেন তথ্যচিত্র 'Hungry Autumn'। এই ছবি দেখে অগ্রজরা চমকে গেলেন। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় স্বয়ং ঋত্বিক ঘটক আনন্দে পশ্চাৎদেশে লাথি মেরে বলেছিলেন, ‘ওইস-সালা, ফাটায়া দিছিস!’
জীবিকার প্রয়োজনে করেছেন বিজ্ঞাপনের ছবিও। কিন্তু তথ্যচিত্র আর চলচ্চিত্র তার ক্ষুধা নিবৃত্তির মূল জায়গা। বিসমিল্লাহ্ খানকে নিয়ে করা তথ্যচিত্র তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্ম। রাজা রামমোহন রায়, দালাই লামা, কে. জি. সুব্রামানিয়ান, সত্যজিৎ রায়, উৎপল দত্ত, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিয়ে করা তথ্যচিত্র গৌতম ঘোষের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘দখল’, ‘পার’, ‘মনের মানুষ’, ‘আবার অরণ্যে’, ‘গুড়িয়া’, ‘পতঙ্গ’, ‘অন্তর্জলী যাত্রা’, ‘দেখা’, ‘শূন্য অঙ্ক’।
প্রথম চলচ্চিত্র ‘মা-ভূমি’ নির্মাণের পূর্বে উত্তম কুমারকে নিয়ে ‘শ্রীমতি কাফে’ করার কথা ছিল। সম্মতও ছিলেন উত্তম কুমার। কিন্তু ‘মা-ভূমি’ হল, ‘শ্রীমতি কাফে’ হল না। ‘মা-ভূমি’র দুশোদিনের সেলিব্রেশনের দিন গৌতম ঘোষের জন্মদিন__ ২৪ জুলাই, ১৯৮০ সাল। সেইদিনই মৃত্যু হল মহানায়কের। এ যেন জন্ম-মৃত্যু, স্বপ্ন-কর্ম, ভাবনা-বাস্তবায়নের এক তুমুল বৈপরীত্যদশা।
গৌতম ঘোষের কর্ম শুধু শিল্পের খাতিরে শিল্প নয়, আমূল এক দায়বদ্ধতার স্মারক। ‘গৌড় তপস্বী মহীরুহ’ তাঁর জীবনের আশ্চর্য পরিভ্রমণের সাথে-সাথে বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসের অখণ্ড এক দলিল। প্রথমবার প্রকাশিত হল ‘ছাপাখানার ভূত’ থেকে।
এই গ্রন্থ সমঝদার পাঠকের দরবারে ভাব-উৎসারিত এক নৈবেদ্যস্বরূপ।