ম’তে মন্বন্তর। ম’তে মহামারী। ম’তে মৃত্যু। জীবনানন্দের কাছে কার্তিক চিরকাল শস্যকাল। তাই এই ম’হীনের ঘোড়াগুলি কার্তিকের ফসলের মাঠে তপ্তরবির কিরণে যে শস্য ফলায়, তার মধ্যে প্রাণমেদুর জ্যোৎস্না। আলোকভাসান পূর্ণিমা।
'আমরা যাইনি ম’রে আজও, তবু কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয়...' প্রাণের ক্ষিপ্রতায় তাঁরা বেঁচে রয় ঠিকই, কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট মানুষের অন্নাভাব রচনা করে নবনব দৃশ্যদল।
'প্রস্তরযুগের সব ঘোড়া যেনএখনও ঘাসের লোভে চড়ে
পৃথিবীর কিমাকার ডায়নামোর ‘পরে...' ফসলের মাঠের ধারণা ছিল না প্রস্তরযুগে। নব্যপ্রস্তরযুগে এল কৃষির ধারণা। মহীনের ঘোড়া অর্থাৎ কৃষকের ক্ষেতে এল কিমাকার ডায়নামো। প্রস্তরযুগের এইসব লোভী ঘোড়া আর কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরের মহীনের ঘোড়াদের মধ্যে তাই বিস্তর ফারাক।
নব্যপ্রস্তরযুগে এল কৃষির ধারণা। তারপর?
এক ছুটিরদিনের রাতে কবির লেখার টেবিলে এল এক ত্রস্ত জোনাকী। বিদ্যুতের আলোয় সে বলল বিপণ্ন তার গল্প। এই ধারণা থেকে মনে এল কবির জন্মের সাল। ১৮৯৯ সাল__ তাঁর জন্মের পায়ে-পায়ে প্রথম বিদ্যুৎ এল কলকাতায়। আর কৃষকের ক্ষেতে ডায়নামো।
এই কৃষকেরা আবার ফিরে যায় অন্য অস্তিত্ব সঙ্কটের কাছে। নীলদর্পণ-এর লেখক দীনবন্ধু মিত্র, অদম্যবিপ্লবী বিশ্বনাথ সর্দারও আসে তাঁর কাছে। কৃষকের রক্ত শুষে খেয়েছিল একদল সাহেব-রাক্ষস__ সেই গল্প শোনায়।
২০০৭ সালের ১৪ই মার্চের উত্তাল নন্দীগ্রামের কৃষকেরও নিয়তিও লেখা হয় ত্রিকালজ্ঞ কবির কবিতার পঙক্তিতে, ‘বিষণ্ন খড়ের শব্দ ঝ’রে পড়ে ইস্পাতের কলে__ আঠারশতকেই ইস্পাতের সহজলভ্যতায় সেইসব কৃষকের ধানীক্ষেত করল দখল শিল্পের কল।
যে ঘাস ঘোড়ার আহার, সেই ঘাস মন্বন্তরে মানুষেরও অন্ন হয়। চরম আকালে ঘোড়াও হয়ে যায় মানুষের আহার্য। জীবনের প্রতীকরূপে উদ্ভাসিত এই ঘোড়া কোন মাঠে ঘাস খাবে?
জীবনানন্দ দাশের 'ঘোড়া' কবিতার স্বয়ং মহীনের ঘোড়াই এই উপন্যাসে করেছে তার ঈশ্বরের বারোকুঠুরির কাব্যচৈতন্যের খণ্ডন। বাংলাসাহিত্যে একটি বিমূর্ত কবিতার ব্যবচ্ছেদে একটি পূর্ণ উপন্যাস__ এ এক নবঘটনা।
বিচিত্র পরিভ্রমণের মধ্য দিয়ে নিজেকে আবিষ্কারের আনন্দ নিয়ে লিখেন সাজ্জাদ হুসাইন। বিরল মানুষ এবং প্রকৃতি তার লেখার প্রাণশক্তি। লেখার জন্য কখনও ঢুকে পড়েন দার্জিলিংয়ের মেঘ-কুয়াশার মধ্যে, অঞ্জন দত্তকে সঙ্গে নিয়ে। সেখানে গিয়ে অদ্ভুত নস্টালজিয়ার মধ্যে ডুবে গিয়ে রচনা করেন অঞ্জন দত্তর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘অঞ্জনযাত্রা’। এরপর আবার থিয়েটারের অঞ্জনকে নিয়ে চলে যান কলকাতার হাতিবাগানের ধসে পড়া থিয়েটারপাড়ায়। সেখানে প্রখর রোদ্দুরে অঞ্জন দত্তকে সাথে করে চলে যান নটী বিনোদিনীর বাড়ির সামনে। রাস্তার মাঝখান বরাবর দাড়িয়ে থাকা গিরীশ ঘোষের বাড়ির কম্পাউন্ডে। ম্যাজিক্যাল থিয়েটার ‘সারকারিনা’য়। সেই সূত্রে ‘ছাপাখানার ভূত’-এর উদ্যোগে ঢাকার মঞ্চে প্রথম মঞ্চস্থ হয় অঞ্জন দত্তর প্রথম নাটক ‘সেলসম্যানের সংসার’। সাজ্জাদ লিখেন অঞ্জন দত্তর নাট্যজীবন নিয়ে দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘নাট্যঞ্জন’। খুড়ে খুড়ে খুজে বের করেন অন্য এক অঞ্জনকে। এরপর সাজ্জাদ বেরিয়ে পড়েন মৃত্যুর অপার রহস্যময়তা জানার সন্ধানে। ঈশ্বরবিশ্বাস, পরকাল, পুনর্জন্ম, আত্মা-শরীর, মহাকাল ছাপিয়ে বের করতে চান কর্মের বিশালতাকে। সেই ভাবনা থেকে ৩ খণ্ডে রচিত হয় নন্দিতজনদের নিয়ে বিশেষ সংকলনগ্রন্থ ‘এখানে মৃত্যু নেই’। এই গ্রন্থের কাজ চলতে চলতে অনন্তের যাত্রায় ছুট দেন সেইসব নন্দিতজনদের কেউ কেউ। চলে যান নবনীতা দেবসেন, মুর্তজা বশীর, নিমাই ঘোষ, নিমাই ভট্টাচার্য, আমজাদ হোসেন… তারা অন্তর্লোকে চলে যান। কিন্তু তারা রয়ে যান কর্মে। আর দিয়ে যান ঈশ্বরবিশ্বাস, মৃত্যুচেতনা, মানবজীবন, পরকাল, পুনর্জন্ম, মহাকাল নিয়ে নিজস্ব ভাবনার কথা। সেগুলো মায়া দিয়ে রচনা করেন সাজ্জাদ। সাজ্জাদ হুসাইন আবিষ্কার করেন কবীর সুমনের গানের বাইরের এক্সাইটিং এক সত্তাকে। তার আত্মদর্শন নিয়ে লিখেছেন ‘কবীরা’। লিখেছেন চারুলতাখ্যাত শিল্পী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের থিয়েটার, সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, পূর্ণেন্দু পত্রীসহ নানান বিরল শিল্পীদের সাথে পরিভ্রমণের আদ্যোপান্ত নিয়ে আত্মকথনমূলক গ্রন্থ ‘মাধবীর জন্যে’।তার লেখা বাংলাদেশের কিংবদন্তিতুল্য দুই শিল্পী ববিতা ও এটিএম শামসুজ্জামানকে নিয়ে আত্মকথনমূলক গ্রন্থও প্রকাশিত হয়ে গেছে এরইমধ্যে। বই দুটির নাম যথাক্রমে ‘বিস্ময়ে ববিতা’ ও ‘আমি আমি’।দুই বাংলার কালোত্তীর্ণ গানের দল ‘মহীনের ঘোড়াগুলি’র সকল সদস্যদের সাথে আড্ডা, গল্প, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে করে ৩ বছরের পরিভ্রমণ শেষে রচনা করেন একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ‘মহীনের ঘোড়াগুলির গান’। এইসব পথ পেরিয়ে সাজ্জাদ হুসাইন এখন বেরিয়ে পড়তে চান অন্য পথে। যেখানে আরও আরও অদ্ভুত মানুষেরা রয়েছে। রয়েছে প্রকৃতি। রয়েছে বিস্ময়। যা ফেলে আসা পথকে নতুন পথের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে।চিন্তা-চেতনার উস্কানিতে অক্লান্ত হেটে চলের এই আর্বান পথিক…