বর্তমান বিশ্বে ইসলামী ব্যাংকিং-এর তাত্ত্বিক মুরুব্বি হিসেবে যাদের গণ্য করা হয়Ñআল্লামা তাক্বী উসমানী তাদের অন্যতম। আধুনিক ও প্রাচীন ফিকহুল মু‘আমালাতকে প্রচলিত ব্যাংকিং-এর সাথে সমন্বয় করে ইসলামী ব্যাংকিং-এর যে রূপরেখা তিনি দিয়েছেন তা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী। ইসলামী ব্যাংকিং সম্পর্কিত তাঁর লেখাগুলো অধ্যয়ন করলেই ফিকহুল মু‘আমালাতে তাঁর অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইসলামী বাণিজ্য আইনের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামী ব্যাংকের শরিয়াহ বোর্ডের সদস্য হিসেবে লব্ধ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বর্তমান অবস্থানে পৌঁছাতে তাঁকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।
বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী তাক্বী উসমানীর ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে লিখিত বহু প্রকাশনার মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওপর লিখিত ‘‘An Introduction to Islamic Finance’’ বইটি নিঃসন্দেহে একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা। ইসলামী অর্থায়নের নীতিমালা গভীরভাবে অধ্যয়নের সুযোগ যাদের নেইÑ তাদের জন্য এ বইটি হতে পারে এক অনন্য সাধারণ গাইড বই।
আমার জানামতে ইংরেজি ভাষায় রচিত এ বইটি ইতোমধ্যেই উর্দু ভাষায় তরজমা করা হয়েছে এবং উক্ত তরজমাকৃত বই থেকে ইতোমধ্যে তা বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। অনুবাদ কখনো মূল বইয়ের স্বাদ মেটাতে পারে না। আর যদি তা হয় অনুবাদের অনুবাদ তাহলে তা আরো পারে না। বাজারে প্রচলিত বাংলা ভাষার অনুবাদটি হয়েছে উর্দু থেকে; মূল ইংরেজি থেকে নয়। ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একজন নগণ্য ছাত্র হিসেবে আমার মনে হয়েছে ইংরেজি ভাষায় রচিত বইটি থেকে সরাসরি অনুবাদ করা হলে তা আরো যথার্থ হতো। সেই উপলব্ধি থেকেই ইংরেজি ভাষার মূল বইটি বাংলায় অনুবাদের এ প্রয়াস। প্রয়াস কতটুকু সফল হয়েছে তা বিশ্লেষণের দায়িত্ব সম্মানিত পাঠকবৃন্দের।
এমন মৌলিক একটি বইয়ের অনুবাদ করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যে জ্ঞান এবং পরিপক্বতা থাকা প্রয়োজন তার কোনোটিই আমার নেই। অতএব, অনুবাদের হক আদায় হয়েছেÑ এমনটি দাবি করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এতটুকু সম্ভবত বলা যায় যে, অনুবাদ নিখুঁত করার ক্ষেত্রে আমার চেষ্টা ও সাধ্যের কোনো ত্রুটি আমি করিনি। তবে জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অপরিপক্বতার কারণে অনুবাদ কর্মে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকাটা খুবই স্বাভাবিক। অনিচ্ছাকৃত সেসব ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য আল্লাহ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। সম্মানিত পাঠকবৃন্দের কাছে বিনীত অনুরোধ, যে কোনো ধরনের ত্রুটি বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে সে সম্পর্কে এই নগণ্য বান্দাকে দয়া করে অবহিত করুন। আপনাদের সংশোধনী কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করা হবে ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে বিনীত আরজ, তিনি যেন এ ক্ষুদ্র প্রয়াস কবুল করেন এবং আখিরাতে নেকির পাল্লায় তা অন্তর্ভুক্ত করেন।
প্রখ্যাত ইসলামি ব্যক্তিত্ব শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ তকী উসমানী শুধু ইসলামের নানা বিষয় নিয়ে বই রচনা করেননি, তিনি একাধারে ইসলামি ফিকহ, হাদীস, তাসাউফ ও ইসলামি অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ। আর তা-ই নয়, তিনি একজন বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় শরীয়াহ আদালতে, এমনকি পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের শরীয়াহ আপিল বেঞ্চেরও বিচারক পদে আসীন ছিলেন। মুফতী মুহাম্মদ তকী উসমানী ভারতের উত্তর প্রদেশের দেওবন্দে ১৯৪৩ সালের ৫ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান দুটি আলাদা রাষ্ট্রে পরিণত হলে তার পরিবার পাকিস্তানে চলে আসে এবং এখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। শিক্ষাজীবনে তিনি বিভিন্ন জায়গা থেকে ইসলামি নানা বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়েও শিক্ষা নিয়েছেন। তিনি করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, যেখান থেকে অর্থনীতি, আইনশাস্ত্র ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জন করেন। আর পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাভ করেছেন আরবি ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ. ডিগ্রি। দারুল উলুম করাচি থেকে পিএইচডি সমমানের ডিগ্রি অর্জন করেছেন ইসলামি ফিকহ ও ফতোয়ার উপর। সর্বোচ্চ স্তরের দাওয়া হাদিসের শিক্ষাও তিনি একই প্রতিষ্ঠান থেকে গ্রহণ করেন। বিচারকের দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিভিন্ন ইসলামি বিষয়, যেমন- ফিকহ, ইসলামি অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমির স্থায়ী সদস্যপদ রয়েছে তাঁর। পাকিস্তানে 'মিজান ব্যাংক' নামক ইসলামি ব্যাংকিং সিস্টেম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পাকিস্তানে ইসলামি অর্থনীতির প্রসারে তিনি বিশেষ অবদান রেখেছেন। তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য বইও। তকী উসমানীর বই এর সংখ্যা ৬০ এর অধিক। শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ তকী উসমানী এর বই সমূহ রচিত হয়েছে ইংরেজি, আরবি ও উর্দু ভাষায়। শাইখুল ইসলাম মুফতী মুহাম্মদ তকী উসমানী এর বই সমগ্র এর মধ্যে 'Easy Good Deeds', 'Spiritual Discourses', 'What is Christianity?', 'Radiant Prayers' ইত্যাদি ইংরেজি বই, ও 'তাবসেরে', 'দুনিয়া মেরে আগে', 'আসান নেকিয়া' ইত্যাদি উর্দু বই উল্লেখযোগ্য। এসকল বই ইসলাম প্রসারে, এবং বিভিন্ন ইসলামি ব্যাখ্যা প্রদান ও আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।