ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের অধীনে, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ‘তারাশঙ্করের ছোটগল্পে প্রান্তিক চরিত্রের স্বরূপ’ শীর্ষক এম. ফিল. গবেষণা অভিসন্দর্ভ সম্পন্ন হয়েছে। অভিসন্দর্ভ রচনায় নিয়ত তাগিদ ও সুচিন্তিত প্রয়োজনীয় পরামর্শদানে তিনি আমাকে উপকৃত করেছেন। তিনি নানামুখী দিক-নির্দেশনা, সময়োপযোগী মতামত ও প্রয়োজনীয় সংখ্যক গবেষণা-উপযোগী গ্রন্থ প্রদান করে আমার গবেষণাকর্মকে করেছেন ত্বরান্বিত। গবেষণার বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের আমার প্রিয় শিক্ষক প্রফেসর আহমদ কবির। তাঁর কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য। একই বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ ও প্রফেসর ড. সৌমিত্র শেখর বিভিন্ন সময়ে গবেষণা-উপযোগী তথ্য প্রদান করে আমাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছেন। তাঁদের অবদান কখনো ভুলবার নয়।
রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কথাসাহিত্যের প্রবাদপ্রতিম কথাকোবিদ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১)। রাঢ় বাংলার নন্দিত কথাকার তিনি। বাংলা কথাসাহিত্যে, বিশেষত ছোটগল্পে তাঁর বিচরণ সর্বপ্রসারী। তাঁর ছোটগল্পের বর্ণাঢ্য ও বিস্তীর্ণ পরিসরে উঠে এসেছে রাঢ়ের প্রান্তিক জনজাতির বহুবর্ণিল জীবনকথা। অথচ এ প্রান্তিক চরিত্রের স্বরূপবিষয়ক গবেষণা সীমিত পরিমাণেই হয়েছে। আমাদের এ অভিসন্দর্ভে রাঢ় বাংলার মৃত্তিকাঘনিষ্ঠ মানুষের নানামুখী বৃত্তি, বৈচিত্র্যময় আচার-অনুষ্ঠান, সংস্কার-সংস্কৃতি, ধর্ম, টাবু, টোটেম প্রভৃতি গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষিত হয়েছে। আদিবাসী বাউরি, বাগ্দি, ডোম, হাড়ি, চাণ্ডাল, সাঁওতাল, বেদে প্রভৃতি বর্ণ-উপবর্ণের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির একনিষ্ঠ মূল্যায়ন অভিসন্দর্ভটিতে বিশেষ প্রযত্নে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ‘তারাশঙ্করের ছোটগল্পে প্রান্তিক চরিত্রের স্বরূপ’ শীর্ষক অভিসন্দর্ভের আলোচনা বিন্যস্ত হয়েছে তিনটি অধ্যায়ে।
প্রথম অধ্যায়ের শিরোনাম ‘তারাশঙ্করের দেশ-কাল ও সাহিত্য ভাবনা।’ এ অধ্যায়ে তারাশঙ্করের মানসপ্রবণতা, ব্যক্তিজীবন ও সমাজ-প্রতিবেশ বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপিত হয়েছে। বিশেষত দেশ-কালের পরিপ্রেক্ষিতে প্রান্ত-জনজাতি সম্পর্কে তারাশঙ্করের ভাবনার নবীকরণ করা হয়েছে এই অধ্যায়ে।
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ‘বাংলা ছোটগল্পে তারাশঙ্করের অবস্থান’। এ অধ্যায়ে বাংলা ছোটগল্পের প্রবহমান ধারায় রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গল্পকারের অবদান ও প্রবণতা উপস্থাপিত হয়েছে। বাংলা ছোটগল্পে তারাশঙ্করের প্রাতিস্বিকতা ও অনন্যতা এ অধ্যায়ে বিশ্লেষিত হয়েছে।
তৃতীয় অধ্যায়ের শিরোনাম ‘তারাশঙ্করের ছোটগল্পে প্রান্তিক চরিত্রের স্বরূপ বিশ্লেষণ’Ñ এ অধ্যায়কে তিনটি পরিচ্ছেদে বিন্যস্ত করা হয়েছে।
ক. জীবন
খ. জীবিকা এবং
গ. সংস্কার ও সংস্কৃতি
রাঢ় বাংলার প্রান্তিক জনজাতির যে জীবনাচার মহৎ শিল্পী তারাশঙ্করের ছোটগল্পে বর্ণিত হয়েছে, তা এ অধ্যায়ে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্যে রূপাঙ্কিত হয়েছে। রাঢ়ের প্রান্তস্পর্শী মৃত্তিকাশ্রিত বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, গোত্র ও গোষ্ঠীভুক্ত মানুষের অকথিত জীবন, জীবিকা, সংস্কার ও সংস্কৃতির বিমিশ্র এক জগতের বর্ণনা নবতর দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপিত হয়েছে এ অধ্যায়ে।
‘উপসংহার’ অংশে বর্ণিত হয়েছে পূর্ববর্তী তিন অধ্যায়ে উপস্থাপিত বক্তব্যের সারাৎসার। এ অংশে প্রান্তিক চরিত্র চিত্রণে তারাশঙ্করের অবস্থান বিশেষভাবে সুচিহ্নিত করা হয়েছে।
গবেষণা-অভিসন্দর্ভ সুষ্ঠুভাবে রচনার জন্য আমি ব্যবহার করেছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, কবি সুফিয়া কামাল কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের সেমিনার, আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। বিশেষত ক্যান্টনমেন্ট কলেজের গ্রন্থাগার প্রভাষক জনাব মো. শামসুল আলম নানা সময়ে প্রয়োজনীয় গ্রন্থ প্রদান করে আমাকে ধন্য করেছেন। অভিসন্দর্ভ মুদ্রণে আমাকে ঋণী করেছেন আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ইনফরমেশন সেলের মোহাম্মদ হারুন-অর-রশিদ খাঁন।
সহধর্মিণী শিরি রহমানের হাসিমুখ আমাকে নিরন্তর উদ্দীপিত করেছে অভিসন্দর্ভ রচনায়। পুত্র অরণ্যের লাবণ্যদীপ্ত মুখশ্রী আমাকে দিয়েছে নীরব প্রেরণা। এদের প্রতি আমার অফুরান ভালোবাসা।