‘ও আকাশ তুমি গাও’ এই নামের মধ্যেই আছে এক ধরনের বিস্তার, আহ্বান এবং অন্তর্লীন আকুতি। এখানে আকাশ কেবল প্রকৃতির বিস্তৃতি নয়; এটি মুক্তির প্রতীক, অসীমতার প্রতিধ্বনি, মানুষের অদম্য স্বপ্নের রূপক। কবি যেন নিজের সীমিত উচ্চারণকে ছেড়ে দিয়ে বৃহত্তর সত্তাকে ডাকছেন— তুমি গাও, তুমি উচ্চারণ করো সেই সুর, যা একক কণ্ঠে সম্পূর্ণ হয় না। এই নাম তাই ব্যক্তিমানুষের ভেতর থেকে সমষ্টির দিকে, নীরবতা থেকে উচ্চারণের দিকে, অন্তরাল থেকে অনন্তের দিকে যাত্রার ইঙ্গিত বহন করে। বইটির কবিতাগুলোও সেই আকাশের মতোই বিস্তৃত— কখনও মেঘময়, কখনও রৌদ্ররাগিণী, কখনও নির্মল, কখনও বজ্রনিনাদী, তবু শেষ পর্যন্ত সুরময়।
জামিল বিন খলিলের কবিতা কষ্টায়ত্ত নয়; তা সহজাত, স্বগতিময়। যেন অন্তরের নিজস্ব ছন্দে উচ্চারিত এক নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ। কবিতার প্রতি তার রয়েছে সুগভীর অনুরাগ, পাশাপাশি রয়েছে অবিরাম নিরীক্ষার সাহস। স্বরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও অক্ষরবৃত্তের মতো নিয়ন্ত্রিত ছন্দে যেমন তার স্বচ্ছন্দ বিচরণ, তেমনি চিত্তছন্দের চিত্রকল্পনির্ভর নির্মাণেও তিনি সমান পারদর্শী।
শব্দ তার কাছে কেবল উচ্চারণ নয়, উপাদান; ভাব তার কাছে কেবল অনুভূতি নয়, নির্মাণের বুনন। সেই শব্দ ও ভাবের সূক্ষ্ম বিন্যাসে তিনি রচনা করেন এক বিস্তৃত কবিতার আকাশ, যেখানে ভেসে থাকে অনুভবের মেঘ, চিন্তার পাখি, আর আলোর রেখা। সেই আকাশ দৃশ্যমানও, অনুভবযোগ্যও।
এই কাব্যাকাশে আশ্রয় পায় মানবতা, সময়চেতনা ও মহাকালীন জীবন-জিজ্ঞাসা। ব্যক্তিগত অনুভবের ভেতর দিয়ে তিনি স্পর্শ করেন সমষ্টিগত বেদনা ও স্বপ্নকে। তার কবিতায় যেমন আছে প্রেম ও প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, তেমনি আছে অস্তিত্বের গভীর প্রশ্ন, মানুষ হয়ে ওঠার দায়।
এই গ্রন্থের কবিতাগুলো শুধু পাঠ নয়, এক কাব্যিক অন্তরযাত্রার আহ্বান। যে পাঠক এই আকাশের দিকে তাকাবে, সে হয়তো নিজেরই কিছু অচেনা শব্দ আর অনুচ্চারিত অনুভব খুঁজে পাবে।