ডিজিটাল যুগ আমাদের সামনে এক অভূতপূর্ব বাস্তবতা হাজির করেছে। যোগাযোগ বেড়েছে, গতি বেড়েছে, তথ্যের প্রাচুর্য বেড়েছে—কিন্তু একই সঙ্গে কমেছে স্থিরতা, গভীর মনোযোগ ও অন্তর্দর্শনের সময়। আমরা সবসময় সংযুক্ত, অথচ অনেক সময় নিজের সঙ্গেই বিচ্ছিন্ন। এই প্রেক্ষাপটে “ডিজিটাল সুস্বাস্থ্য (ডোপামিন নিয়ন্ত্রণ কৌশল)” গ্রন্থটি শুধু সময়োপযোগী নয়—অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এক উদ্যোগ।
এই বইয়ে লেখক আধুনিক ডিজিটাল আসক্তির জৈবিক ও মনোবৈজ্ঞানিক ভিত্তি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। মানব মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থা—বিশেষত ডোপামিন সিস্টেম—কীভাবে আচরণ, অভ্যাস ও মনোযোগকে প্রভাবিত করে, এবং প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশ কীভাবে সেই ব্যবস্থাকে অবিরাম উত্তেজিত রাখে—তার একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখানে পাওয়া যায়। নিউরোসার্জারিতে প্রশিক্ষণরত একজন চিকিৎসক হিসেবে লেখকের মস্তিষ্কসংক্রান্ত বাস্তব জ্ঞান এই আলোচনাকে দৃঢ় ও প্রামাণ্য ভিত্তি দিয়েছে। তিনি জটিল বিষয়গুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যাতে সাধারণ পাঠকও তা অনুধাবন করতে পারেন।
এই গ্রন্থ সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আমি বিশেষভাবে লক্ষ্য করেছি—লেখক কেবল তথ্য উপস্থাপন করেননি; তিনি পাঠকের সঙ্গে একটি চিন্তাগত সংলাপ তৈরি করতে চেয়েছেন। বিষয়বস্তুর বৈজ্ঞানিক যথার্থতা, যুক্তির ধারাবাহিকতা, ভাষার স্বচ্ছতা এবং নৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি। আলোচনার গভীরতা যেন অক্ষুণ্ণ থাকে, আবার পাঠযোগ্যতাও যেন নষ্ট না হয়—এই ভারসাম্য রক্ষায় সম্পাদনার সময় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গ্রন্থটির বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি কেবল সমস্যার বিশ্লেষণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং বাস্তবসম্মত, প্রয়োগযোগ্য সমাধানের পথও দেখিয়েছে। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও কর্মক্ষেত্র—তিনটি স্তরেই মনোযোগ পুনরুদ্ধারের কৌশল আলোচনা করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে কুরআন ও হাদিসের প্রাসঙ্গিক আলোচনা সংযোজন বইটিকে এক নৈতিক ও আত্মশুদ্ধিমূলক মাত্রা দিয়েছে। ফলে বিজ্ঞান ও মূল্যবোধ—দুই ধারাই এখানে এক স্রোতে মিলিত হয়েছে।
সম্পাদক হিসেবে আমার দায়িত্ব ছিল গ্রন্থটির সাহিত্যিক মান, বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং উপস্থাপনার শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আমি সচেষ্ট থেকেছি যেন লেখকের মৌলিক কণ্ঠস্বর অক্ষুণ্ণ থাকে। কারণ একটি বইয়ের প্রাণ নিহিত থাকে লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিতে; সম্পাদক কেবল তাকে পরিশীলিত ও সুসংগঠিত রূপ দিতে সহায়তা করেন।
আমার বিশ্বাস, এই গ্রন্থ পাঠকের কেবল জ্ঞানই বৃদ্ধি করবে না; বরং আত্মসমালোচনা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সুস্থ ডিজিটাল জীবনধারার অনুপ্রেরণা জোগাবে। বর্তমান প্রজন্ম, অভিভাবক, শিক্ষক ও পেশাজীবী—সবার জন্যই এটি প্রাসঙ্গিক।
ডা. সাদী মাসুদ আল তুরাব একজন প্রতিশ্রুতিশীল চিকিৎসক ও মননশীল লেখক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠোর বাস্তবতা এবং মানব-মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ—দুয়ের সমন্বয় তাঁর লেখায় স্পষ্ট। আমি আশা করি, ভবিষ্যতেও তিনি সমাজসচেতন ও বিজ্ঞানভিত্তিক রচনার মাধ্যমে পাঠকসমাজকে সমৃদ্ধ করবেন এবং সুস্থ চিন্তার সংস্কৃতি গঠনে অবদান রাখবেন।
লেখকের প্রতি আমার আন্তরিক শুভকামনা রইল। তাঁর এই প্রয়াস পাঠকমহলে সমাদৃত হবে এবং সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে—এই প্রত্যাশা করছি।
অধ্যাপক ডা. এম. এ. বাকী