মিম আদালত কক্ষে ঢুকল। সবাই এসে গেছে। মিমের বাবা ডাক্তার জাহিদ হাসানের প্যারোলের সিদ্ধান্ত হবে আজকের কোর্টে। জাহিদ সাহেব কোর্ট রুমের একপাশে বসে আছেন। পাশে পুলিশ। ১০ বছর আগে মিমের মাকে হত্যার অভিযোগে জাহিদ সাহেবের যাবজ্জীবন হয়।
সেই ঘটনা মিমের এখনো স্পষ্ট মনে আছে। উত্তরায় তাদের দোতালা বাসা। চারপাশে বাগান। সামনে ড্রাইভওয়ে। ডাক্তার জাহিদ হাসান ভালো ডাক্তার। স্ত্রী রোখসানা বেগম বড়ো জার্নালিস্ট। একটিভিস্ট । দুই মেয়ে এক ছেলে। সাজানো সংসার। মিমের তখন ১৬ বছর বয়স। রাইসা ১৮। রাশেদ ২০। পিঠাপিঠি।
মিম কলেজ থেকে ফিরে বাসায় ঢুকে দেখে সিঁড়ির পাশে মায়ের মৃতদেহ। রক্তে ভেসে গেছে চারপাশ। বাবা পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হাতে ধরা ছুরি থেকে তখনো রক্ত ঝরছে। বাবা কেমন অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মিমকে বললেন কাছে না যেতে।
মিম চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। চোখ বেয়ে পানি পড়ছিল। স্কুল থেকে আসলে মা ব্যাগ নিয়ে নিতেন। টেবিলে মিমের প্রিয় কোন খাবার আইটেম। ব্যাগ খুলে সব গুছিয়ে রাখা। সব মা করতেন। হাজার ব্যাস্ততার মাঝেও। সেই মা পড়ে আছেন ফ্লোরে।
রাইসা, রাশেদ বাসায় ছিলোনা। বাবাই জরুরি নম্বরে ফোন দেন। পুলিশ আসতে সময় লাগেনি। কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের গাড়ি, সাংবাদিক, উৎসুক মানুষ, .. এত শব্দ, এতো কথা চারপাশে, কিন্তু মিমের কাছে মনে হচ্ছিল গভীর নিঃশব্দতা।
বাবা অনেকবার বলেছিলেন তিনি খুন করেননি। অন্য কেউ করেছে। তিনি এসে দেখেন রোখসানা মেঝেতে। বুকে ছুরি। তখনো জ্ঞান ছিল। কি যেন বলতে চেয়েছিল। পারেনি। তিনি কেন খুন করবেন?
কেউ বাবার কথা শুনল না। হাতকড়া পরিয়ে গাড়িতে উঠানোর সময় রাইসা এবং রাশেদ হাজির। রাইসা কাঁদছিল। রাশেদের চোখে ঘৃণা বাবার জন্য। বাবা তাদের মাকে মেরেছেন। প্রিয় মা। শুধু এই জন্যই বাবাকে হাজার বছর ঘৃণা করা যায়।
আদালতে ডা. জাহিদ দোষী সাব্যস্ত হন। রাশেদ বাবার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেয়। বাবা মায়ের একটু দূরত্ব ছিল। মাঝে মাঝে ঝগড়াও হতো শেষ দিকে। মা ছিলেন জার্নালিস্ট। পত্রিকাগুলোও ডা. জাহিদের পেছনে লেগেছিল।প্রথম থেকে তারা ধারণা করে নেয় তিনিই হত্যাকারী। ডাঃ জাহিদের যাবজ্জীবন হয়।
মিম এখনো বিশ্বাস করে তার বাবা দায়ী নন। বাবা মাকে হত্যা করতে পারেন না। শেষ দিকে বাবা মায়ের একটু দূরত্ব ছিল। মা ছিলেন উচ্চাকাক্সক্ষী। কিন্তু দুজনেই তিন ছেলেমেয়েকে পাগলের মতো ভালোবাসতেন। উথালপাথাল ভালোবাসা। প্রতি সপ্তাহে একবার গভীর রাতে তারা ছাদে বসতো । চা খেত। যখন বাতাস এসে তাদের ভাসিয়ে দিত, তখন তারা গলা ছেড়ে গান ধরতো।
ছেলে মেয়েদের অনেক বড়ো করা ছিল বাবা মায়ের ধ্যান জ্ঞান। এত ভালোবাসার সংসার কেউ নিজের হাতে ছারখার করে দিতে পারে?
তাদের সেই ভালোবাসায় পরিপূর্ণ সংসার ছারখার হয়ে গিয়েছিল।
মায়ের বোন, বাবার কলিগ ডাঃ রুমানা তাদের বাসায় এসে উঠেন। ডাক্তারি ছিল রুমানা খালার জীবন। বিয়ে করেননি। তিনি এসে সংসারের হাল ধরেন। সবার পড়ালেখা শেষ করান। রুমানা খালা না থাকলে কি যে হতো !
মিমের জীবন অবশ্য উলটা পালটা হয়ে যায়। মায়ের হত্যা আর বাবার জেল নিয়ে একটা মেয়ের জীবন সহজ হবার কোন কারণ নেই। কিন্তু রুমানা খালা শক্ত হাতে নর্থ সাউথ থেকে তার পড়ালেখা শেষ করান। মিম বাইরে চলে যেতে পারতো। বাবার জন্য দেশে পড়ে আছে। প্রাইভেট ফার্মে জব। ভালো করছে। সব বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। বিয়ে করবে না। সাহস হয় না। একটাই স্বপ্ন, একদিন বাবা বের হবেন। হত্যাকারীকে খুঁজে বের করবেন। তারপর রাইসা, রাশেদ, বাবা সহ জ্যোৎস্নাভরা রাতে আবার তারা ছাদে বসে গল্প করবে। জোছনার গান গাইবে।