স্বপ্ন মানুষের জীবনে প্রধানতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে আজও সঠিক মিমাংসাসূত্রে আসা সম্ভব হয়নি। অনুষঙ্গটি যে কোটি টাকা প্রশ্নের সমতুল্য, তাতে অবশ্য কোনো সংশয় নেই। সেই স্বপ্নের দোল দ্য আলকেমিস্ট উপন্যাসের মূল চরিত্র সান্তিয়াগোর মধ্যে নতুন দ্যোতনা তৈরি করে দিতে পেরেছিল। ফলশ্রুতিও হয়েছিল মনে রাখার মতো। শেষ পর্যন্ত মেরু পরিবর্তন করতে করতে সে অভিনব দোটানার মুখোমুখি হতে বাধ্য হয়েছিল।
স্বপ্নে উদ্দীপ্ত হওয়ার পূর্বে সান্তিয়াগো ভেড়ার উপর যে বিশ্বাস গড়ে তুলতে পেরেছিল, তা মানুষে মানুষে বিশ্বাসের সীমান্ত ছাপিয়ে বাড়তে বাড়তে সাগরের তলদেশসদৃশ্য হয়ে উঠেছিল, যদিও তা ছিল স্বপ্নে দেখা অভিনব প্রাপ্তির তুলনায় কিছুই নয়। সেই বাস্তব দ্বন্দ্বকে সান্তিয়াগো কিছুতেই অস্বীকার করতে পারেনি। দ্বান্দ্বিকতা সব সময় মানুষকে নতুন করে অন্বেষণমুখি করে তোলে। সেই শর্ত সাদরে গ্রহণ করে সান্তিয়াগো নিজের পালিত ভেড়ার পাল বিক্রি করে নিজস্ব স্বপ্নকে সার্থক করে তুলতে পথে নেমেছিল। বোধ হয় সেই মুহূর্তে মনে করতে পারেনি একটি বিখ্যাত গানের প্রথম ছত্রটি—‘পথ হারাবো বলেই আমি পথে নেমেছি।’
জীবনে সাফল্য লাভের পথ যে আদৌ মসৃণ নয়, তাতেও সান্তিয়াগো এতটুকু বিচলিত হতে পারেনি।। তাই বোধ হয় তাকে পিছনে তাকিয়ে অনুকূল ভাবনায় একবারও ধস্ত হতে দেখা যায়নি। বরং ভেবেছিল, চলার পথ দুর্গম হলেও তার পক্ষে সাফল্য লাভ করা সম্ভব। তাকে মিশরে পৌঁছাতেই হবে স্বপ্নে আদিষ্ট গুপ্তধন লাভ করতে।
সেই পর্বে তার পক্ষে সম্ভব হয়েছে এক বৃদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ করা যিনি নিজেকে সালেমের রাজা হিসাবে পরিচয় দিয়েছেন। সান্তিয়াগো তখন এক অভিনব উদ্দীপনার মুখোমুখি। সেই উদ্দামতা, প্রতিকূলতা জয় করে সামনে চলার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা আর সালেমের জীবন প্রবাহের আদলে নিজেকে চিহ্নিত করার দ্বান্দ্বিক পর্বে সান্তিয়াগো Aristotle কথিত Character is the man হয়ে উঠতে চেয়েছে।
অসংখ্য শাখাপ্রশাখা আর সবুজ পত্র-কুঞ্জের বাহার নিয়ে একটি ক্রমবর্ধিত বটবৃক্ষ এক সময় যেমন করে নিজেকে মহীরুহ করে তোলে, সান্তিয়াগো সেই অর্থে তখন অনুরূপ মানসিক অনুষঙ্গ ছুঁয়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর। সত্যি সত্যি এক তুঙ্গ অবস্থান যা তাকে লাভ করতেই হবে। ঠিক তখনই তাকে প্রতারণার শিকার হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে ফেলতে হয়। এমনি পকেটশূন্য হয়েও অবদমিত ইচ্ছা নিয়ে সান্তিয়াগো একটি স্পটিক দোকানে কাজ নিয়েছিল। সেখানে নিজস্ব বুদ্ধিমত্তার জোরে শুধুমাত্র সে দোকানদারকে উপকৃত করেনি, নিজের স্বপ্নপূরণকে সার্থক করে তুলতে প্রয়োজনীয় অর্থ সঞ্চয় করতেও সমর্থ হয়েছিল।
পরবর্তী পর্বে ক্যারাভ্যানে সান্তিয়াগো দুর্গম সাহারা মরুভূমির যাত্রী। স্থানে স্থানে মরুদ্যানের প্রাকৃতিক হাতছানির মধ্যে ফাতিমার সান্নিধ্য লাভ করার মাধ্যমে ভালবাসার যে উপলব্ধি ঘটেছিল তার মধ্যে, তাতে ছিল স্বপ্ন বনাম ভালোবাসার দ্বান্দ্বিকতা। যোগ বিয়োগ গুন ভাগের নিরিখ দেখিয়ে ফাতিমা জানিয়ে দিয়েছিল, ভালোবাসা কখনো দূরের স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না বরং তা সার্থক পরিপূরক শক্তি হয়ে দেখা দেয়।
ফলত সান্তিয়াগো যখন এমনি অবিস্মরণীয় মগ্নতার মুখোমুখি, ঠিক তখন সে এমন একজন আলকেমিস্ট এর সন্ধান পেয়েছিল যিনি লোহাকে সোনার রূপান্তরিত করতে পারেন।সেই জাদুতে উদ্দীপ্ত সান্তিয়াগো আবার নতুন করে নিজেকে পাল্টাতে শুরু করেছিল। আলকেমিস্ট পারলে তার পক্ষেও পারা সম্ভব। স্বপ্নপূরণের পথে তা ছিল অভিনব বিস্ময়কর উন্মাদনা।
তাতেই সান্তিয়াগো সমুদ্রের গভীর তলদেশসদৃশ্য স্বপ্ন সঙ্গে নিয়ে পিরামিডের দেশে পৌঁছাতে পারলেও শেষ পর্যন্ত কঠোর বাস্তবে গুপ্তধন লাভ করতে পারল না কেন? কেন তার জীবনে গুপ্তধন প্রাপ্তির তুলনায় ভালোবাসা প্রাপ্তি অধিকতর শ্রেয় মনে হল? একেবারে কয়েক হাজার কোটি টাকার প্রশ্ন।
এ উপন্যাসের শেষ বাক্যে সান্তিয়াগো কেন বলল, ‘আমি আসছি ফাতিমা।’ তাহলে তার জীবনে প্রকৃত গুপ্তধন কোনটি এবং কেন? তা কীভাবে কঠোর বাস্তবে লাভ করা সম্ভব? সেই প্রশ্নের কারুশিল্পের শেষ উপলব্ধিতে সান্তিয়াগো মৌলিক অর্থে character is the man হয়ে পাঠকের বুকের গভীরে চিরচিহ্নিত দিকদর্শন হয়ে উঠতে পেরেছে। কেবলমাত্র সেই কারণে এ উপন্যাস পড়তে পড়তে পরতে পরতে যে কেউ মগ্ন পাঠক না হয়ে পারবেন না, জীবনের স্বপ্নবিশ্লেষক হিসাবেও নিজেকে খুঁজে পেতে পারেন।
মুসা আলি