ইরিনা জেলেজনোভার অনুবাদে ইউক্রেনের লোককাহিনির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় দশম শ্রেণিতে পড়ার সময়। সেই বয়সে পাঠ্যসূচির বাইরের কোনো সাহিত্য যখন হাতে আসে, তা শুধু গল্প হিসেবেই নয়— একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতের দরজা খুলে দেয়। ইরিনার অনুবাদ ছিল আশ্চর্য রকমের ঝরঝরে, স্বচ্ছ ও প্রাণবন্ত। ভাষার স্বাভাবিক গতি, চরিত্রগুলোর সহজ অথচ গভীর মানবিকতা এবং কাহিনির অন্তর্গত নৈতিক বোধ আমাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই গল্পগুলোর নায়ক-নায়িকা, বুদ্ধিমান কৃষক, সাহসী কিশোর, রহস্যময় বন কিংবা রূপকথার অলৌকিক অনুষঙ্গ আজও স্মৃতির মণিকোঠায় অমলিন হয়ে আছে। যা আমার শৈশব-কৈশোরের কল্পনাশক্তিকে নীরবে গড়ে দিয়েছিল।
পরবর্তীকালে নটরডেম কলেজে পড়াকালীন সেই স্মৃতিই নতুনভাবে আমাকে অনুবাদের দিকে টেনে আনে। সবুজ পাতা পত্রিকার সম্পাদক শেখ তোফাজ্জেল হোসেনের অনুরোধ— বরং বলা যায়, স্নেহমিশ্রিত চাপেই— দু-চারটি লোককাহিনি অনুবাদ করার সাহস পাই। তখন বুঝতে পারি, অনুবাদ শুধু ভাষান্তর নয়; এটি দুই সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির এক গভীর দায়। মূল গল্পের আবহ, অনুভূতি ও অন্তর্লীন দর্শন অক্ষুণ্ন রেখে নতুন ভাষায় প্রাণ সঞ্চার করাই ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
এই লোককাহিনিগুলো কেবল অতীতের গল্প নয়; এগুলো মানুষের চিরন্তন অনুভূতি, সংগ্রাম, আশা ও নৈতিক শক্তির প্রতিফলন। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মনোজগতের বিকাশে এসব গল্পের ভূমিকা অনন্য। সরল কাহিনির ভেতর দিয়ে তারা শিখতে পারে সাহস, সততা, সহমর্মিতা ও কল্পনার মুক্ত উড়ান। এই গল্পগুলো তাদের চিন্তাকে গভীর করে, অনুভূতিকে সংবেদনশীল করে এবং আনন্দপাঠের মাধ্যমে মনোজগতে এক ধরনের স্থায়ী স্ফূর্তি জাগায়।
আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, অনূদিত লোককাহিনিনির্ভর এই গল্পগুলো সময়ের সীমা অতিক্রম করে আরও বহুযুগ বেঁচে থাকবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগুলো আমাদের মনোজগতের নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠবে, প্রজন্মের পর প্রজন্মের শিশু-কিশোরদের ভাবনার খোরাক ও আনন্দের উৎস জোগাবে। এই সাহিত্যিক যাত্রার সঙ্গে যুক্ত সবাইকে জানাই আমার আন্তরিক শুভকামনা।
মাসুদুল হক (১৯৬৮) কবি, কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও অনুবাদক। আন্তর্জাতিক ব্লগ ও ম্যাগাজিনে নিয়মিত ইংরেজি কবিতা লেখার পাশাপাশি অনুবাদ করে চলেছেন। আদিবাসী জীবন ও লোকসংস্কৃতি তার আগ্রহ ও গবেষণার অন্যতম বিষয়। বাংলা একাডেমির রিসার্স-ফেলো (১৯৯৭-২০০০) হিসেবে অধ্যাপক ড. হায়াৎ মামুদের তত্ত্বাবধানে পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্বব্যিালয় থেকে ২০০৪ সালে; অভিসন্দর্ভ- “নন্দনতত্ত্ব: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশের কবিতা (১৯৪৭-১৯৯০)”।
পেশায় দর্শনের অধ্যাপক। বেশকিছু দিন দিনাজপুরের বীরগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করে অল্প কিছুদিন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, দিনাজপুরে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে সদস্য, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা।
প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ত্রিশ। তার উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ: ‘তামাকবাড়ি’, গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের কবিতার নন্দনতত্ত্ব’।
২০২০ সালের নভেম্বর মাসে তিনি ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা THE POET কর্তৃক ‘International poet of week’-এ ভূষিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক কবিতায় অবদানের জন্য পর্তুগাল থেকে স্বীকৃতি স্বরূপ আর্জন করেছেন গোল্ডেন শিল্ড সম্মাননা (২০২১), এছাড়াও গদ্যসাহিত্যে বগুড়া লেখক চক্র পুরস্কার (২০১১): কথাসাহিত্যে চিহ্ন পুরস্কার (২০১৩), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, লোকসাহিত্যে দিনাজপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার (২০১৪), দিনমুলুক উপন্যাসের জন্য ফিরেদেখা পদক ২০২৫ অর্জন করেছেন। অনুবাদের জন্য চর্যাপদ পুরস্কারে (২০২৩) ভূষিত হয়েছেন।