পৃথিবীতে কোনো কিছুই এমনি এমনি অর্জিত হয় না। প্রতিটি প্রাপ্তির পেছনে থাকে সাধনা, ধৈর্য ও দীর্ঘ সময়ের আত্মনিবেদন। সাহিত্যও তেমনিÑএখানে একজন লেখকের জীবন কাটে ভাবনার গভীরে হারিয়ে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার ও প্রকাশ করতে।
আমার কাছে কবিতা কোনো নির্দিষ্ট নিয়মে আবদ্ধ নয়। হৃদয়ের গভীর থেকে উদ্ভূত অনুভূতি ভাষার রূপ নেয়, যা স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বাধীন। পারিবারিক ব্যস্ততা ও জীবনের প্রতিকূলতা থামাতে পারে না এই সাধনাকে; কারণ শব্দই আমার আশ্রয়।
পরিবার ছেড়ে প্রবাসে এসে এই অনুভব আরও গভীর হয়েছে। লন্ডনের ব্যস্ততা, আলোর ঝলকানি আর মানুষের চলাচলের মাঝেও এক ধরনের নীরবতা আমাকে ঘিরে রাখে। সেই নীরবতায় বারবার ফিরে আসে আপনজনদের মুখÑআম্মুর নিঃশব্দ দোয়া, বড় আপু ও ছোট বোন বিউটির হাসি-মুখর মুহূর্ত। দূরত্ব যত বাড়ে, স্মৃতিগুলো ততই গভীর হয়ে ওঠে।
এই স্মৃতিগুলোই আমাকে লিখতে শেখায়। প্রবাসের একাকিত্ব, না-বলা কথার ভার, হৃদয়ে জমে থাকা অনুভূতিগুলো ভাষা খোঁজে। কখনো গদ্য আসে, কখনো কবিতা—দুয়ের মাঝামাঝি নীরব স্বীকারোক্তি।
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ অবাক করা আজ (২০২২) প্রকাশের মধ্য দিয়ে আমি ব্যক্ত করেছি কবিতার প্রতি প্রেম। যৌথগ্রন্থ অব্যক্ত কথা, রাখাল বালক ও বিদ্রোহীÑপ্রতিটি বইয়ের পাতাতেই আমি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি কবিতার মহিমান্বিত রূপ। সাধনায় আঁকা প্রত্যেকটি কবিতা মনের মাধুরী দিয়ে সাজানো, যা আমার অনুভবের নিঃশব্দ দলিল।
কবিতা কেবল ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি নয়; এটি একটি জাতির মনন, সংস্কৃতি ও সাহিত্যচেতনার প্রতিফলন। তাই কবিতার কাছে ফিরে আসা, মন দিয়ে পড়া এবং সাহিত্যের এই সূক্ষ্ম মাধ্যমের মাধ্যমে নিজেদের অন্তর্গত জগতকে সমৃদ্ধ করা প্রয়োজন।
এই বইয়ের পাতায় স্থান পাওয়া লেখাগুলো কোনো প্রদর্শনের জন্য নয়Ñএগুলো আমার জীবনের কথা, অনুভবের নীরব দলিল, দীর্ঘ সাধনার ফল।
জান্নাতুল ফেরদৌস ডলি সমকালীন সাহিত্যের এক প্রতিশ্রুতিশীল কণ্ঠস্বর। প্রতিভাবান এই কবির জন্ম ২ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সালে, সুনামগঞ্জ জেলায়।
পিতা মো. আব্দুল ওয়াদুদ, যিনি পেশায় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ছিলেন এবং মাতা জেসমিন আক্তার। বোন নাজমিন হিয়া চৌধুরী-এর অনুপ্রেরণায় তার সাহিত্যজগতে প্রথম পদচারণা।
শৈশব থেকেই শব্দ, ছন্দ ও কল্পনার সঙ্গে তার নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে। সৃজনশীল লেখালেখিতে তিনি স্বভাবজাতভাবে পারদর্শী। কবিতার পাশাপাশি গান লেখেন। আবৃত্তিশিল্পী ও নৃত্যশিল্পী হিসেবেও নিজেকে মেলে ধরেছেন।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডন শহরে বসবাস করছেন।
ইংরেজি কবিতা ও অনুবাদক হিসেবে সমানভাবে সক্রিয়, যা লন্ডনের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। তার কবিতায় ধ্বনিত হয় দেশপ্রেম, প্রতিবাদ, প্রেম, নিঃসঙ্গতা, প্রবাসের জীবন, লন্ডনের প্রকৃতি ও নগর বাস্তবতা।
প্রথম কাব্যগ্রন্থ অবাক করা আজ পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। মনের সীমানা নেই তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ। যেখানে কবি সীমাহীন মানবমন, সময় ও আত্মঅনুসন্ধানের অনির্বচনীয় ভাষ্য নির্মাণ করেছেন।
এ পর্যন্ত তিনি অসংখ্য সামাজিক সচেতনতামূলক প্রবন্ধ রচনা করেছেন। সাহিত্যের পাশাপাশি সাংবাদিকতায় যুক্ত। বর্তমানে ইউকে বাংলা রিপোর্টার্স ইউনিটি-এর অর্গানাইজিং অ্যান্ড ট্রেনিং সেক্রেটারি (২০২৬) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তিনি লন্ডনের বিভিন্ন সাহিত্যিক সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য। সমাজের সঙ্গে সংলাপে থাকা এই বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা তাকে বর্তমান প্রজন্মের এক আশাব্যঞ্জক ও দীপ্ত কণ্ঠস্বর হিসেবে চিহ্নিত করেছে।