... রুদ্র সাহাদাৎ : কিছু অপার্থিব সুন্দর, যাঁকে চঞ্চল করেছে
এক.
এই যে জীবনযাপন, সেই জীবনের পারিপার্শ্বিকতা, পারিপার্শ্বিকতার অনেক ভেতরের, অনেক গহনের বিপুল উচ্চারণ—অযোগ্য ক্ষোভ-ক্রোধ, দুনিয়াটাই বদলে ফেলার বিস্ফোরক ভাবনা আর অপ্রতিহত প্রেমময় উচ্ছ্বাস কবিতাভাবনার কেন্দ্রে কেবলই ঘুরে- ঘুরে কথা কয়। এইসব বিচিত্র, অদৃশ্য সব লহরি ঘিরেই একটি মানুষ প্রবেশ করে কবিতার অত্যুজ্জ্বল, কুহকী কমলবনে। ভাবনা ও ভাবুকতার এই দীপমালা ক্রমে ব্যক্তিকে পৌঁছে দেয় মানবসভ্যতার বিশাল সদনে। মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তার গহনে, প্রকৃত ও পরম প্রত্ন অরণ্যে। এভাবেই একটি সচেতন সত্তা মহাবিশ্বের সৃষ্টিবৈচিত্র্যেও নমিত হয়ে পড়ে অজান্তে। ফলে একটা সাধু সদ্ভাব তাকে ঘিরে রাখে সর্বক্ষণ। এই ভাবনা তাকে নিঃস্ব করে দিতে পারে জীবনের কুহেলি মন্দিরে। আবার এই ভাবনাই তাকে রাজন্যের শিরোপা পরিয়ে দিতে পারে। এই শিরোপাই নজরুলের ভাষায় ‘আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্নিশ’...। ভারতীয় সোহং তত্ত্বে যাকে বলা হয় ‘সোহম’ বা ‘আমিই সে অর্থাৎ ব্রহ্ম ও আমি এক বা আমিই ব্রহ্ম’। সুফিশ্রেষ্ঠ মনসুর হাল্লাজও তাই নিজের অভ্রান্ত চেতনার অনুকূলে চিৎকার করেছিলেন ‘আনাল হক’ বলে। এ অবশ্যই পরমস্রষ্টার প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়। বরং এ হলো ব্যক্তিমানুষের অপরিসীম সম্ভাবনা ও শক্তিকে অপ্রিয় শক্তির বিপরীতে উপস্থাপনের এক নান্দনিক উপায়। তাই নজরুলের উক্তিকে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তির অন্যায় অবস্থান ও জুলুম-নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে অতিশয় শক্তিশালী প্রতিবাদরূপে দেখা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে জ্ঞানীমহলে। তবে হ্যাঁ, আগেও বলেছি, এ অপার আত্ম উন্মোচন কাউকে-কাউকে জাগতিক অর্থেই একেবারে নিঃস্বও করে দিতে পারে। তা সত্ত্বেও ভাবনার এসব বিভববিহনে কেউ কি কবিতার জায়নামাজে তাঁর ‘চির উন্নত শির’ ঠেকাতে পারে?
বাংলা কবিতার তরুণ ‘গইর’ (কক্সবাজার অঞ্চলের শব্দ : ঢেউ) রুদ্র সাহাদাৎ ভাবনার এমন মাতাল ইশারা এনে পাঠকের মন ভিজিয়ে দিতে যেন বদ্ধপরিকর। সাগরপারের কবিতার এই সাধক তাঁর নিভৃত অনুভবের পঙক্তিমালা নিয়ে ইতোমধ্যে প্রকাশ করেছেন ‘শঙ্কায় আয়না দেখি না’ (২০১৯), ‘সমুদ্র নিকটবর্তী পানপাতার সংসার’ (২০২০), ‘স্বপ্নহীন চোখ বসন্ত খোঁজে না’ (২০২০), ‘কবিমন হাঁটে দরিয়ানগরে’ (২০২১)। তাঁর কবিতায় দেখা যায় সুন্দরের প্রতীক হয়ে ‘শাদা গাঙচিল’ ঝাঁকে-ঝাঁকে ওড়ে। তাদের বঙ্কিম ঠোঁট থেকে নিঃসৃত হয় নানা ধিক্কার ধ্বনি। কেননা তাদের প্রাণ বাঁচানোর সামুদ্রিক আহার নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে বহুরূপী দূষণের দানবীয় তাণ্ডবে। এই যে দূষণ, এসবের হোতা কারা? এদিকে ইঙ্গিত দিচ্ছেন কবি :
মুখ ও মুখোশের খেলা দেখতে-দেখতে
ক্লান্ত যৌবন
শয়তান এখন মানুষের মুখোশে হাঁটে
মেঠোপথ, রাজপথসহ পাড়া-মহল্লার অলিগলিজুড়ে
মানুষের কর্মকাণ্ডে শয়তানই হতভম্ব—দিশেহারা
মুখ কখনো ইউসুফ
কখনো যেন ফেরাউন।...
সব কথার ভেতরে শুদ্ধতার সন্ধানী রুদ্র সাহাদাৎ একটি দীপ্র প্রতীকে থিতু হতে চান। যে-প্রতীকটি ‘কুহেলিয়া ঘাট’। দেখি, এই প্রতীকটি ঘুরে-ঘুরে আসছে তাঁর কবিতায়। ওই ঘাটে নোঙর ফেললে তাঁর শরীর-মন প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। স্মৃতিমেদুর এই কুহেলিয়া ঘাট মোহবিস্তারে বেশ সক্ষম হয়েছে। পাঠক হিশেবে যেখানে সব ছেড়ে-ছুড়ে খানিক জিরোতে ইচ্ছে করে আমাদেরও। রুদ্র সাহাদাৎ-এর কৃতিত্ব এখানেই। তিনি মোহ আর মায়ার চাদর বিছিয়ে সেই মেজবানে পাঠককে ডাকতে পারেন।
দুই.
রুদ্র সাহাদাৎ কবিতাপাড়ায় পরিচিতস্বর, পরিচিত মুখ। নিরলস সাধনায় তাঁর সহজ কবিমন সর্বক্ষণ যেন তাকিয়ে আছে পৃথিবীর প্রতিটি মুহূর্তের দিকে। বর্ণনা করা যায় না, এমন কিছু অপার্থিব সুন্দর তাঁকে চঞ্চল করে রাখে জীবনের পথে-পথে। বেদনা ও কষ্টের মানবিকতা তাঁর সত্তাকে উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর করে পরিশুদ্ধির উত্তাপে। প্রেমপূর্ণ ও প্রকৃতিমগ্ন এই কবি অন্ধকার ও অন্ধতার সকল দুয়ার ভেঙে আলোয় ভুবন রাঙাতে চান। তাঁর কবিতার শব্দচয়ন ও চলনের গতি সংবেদী পাঠককে সেই বার্তা দিতে চায়। শ্রেণিবিন্যস্ত সমাজের সীমাবদ্ধতা ও কলুষতা রুদ্র সাহাদাৎকে পীড়িত ও ন্যুব্জ করে। কবিতার ব্রহ্মাণ্ডে কবি তাই কখনও—কখনও প্রতিবাদী। ঠিক পাশেই হতাশা ও পরিব্যাপ্ত অপ্রাপ্তির ক্ষোভ তাঁকে প্রকৃত সংবেদনের কাছে নতজানু করেছে, যা কখনও-বা নিয়তি বা ললাটলিখনের নামান্তর। পৃথিবী বহু যুগন্ধর কবি-শিল্পীই এই নিয়তির তটে তাঁদের চেতনার রুধিরাক্ত অর্ঘ্য অর্পণ করে গেছেন সজল নয়নে। একালের মানুষও কি তা থেকে মুক্তি পেয়েছে খুব একটা?
রুদ্র সাহাদাৎ এর উচ্চারণ সেদিকে ইঙ্গিত করছে মর্মান্তিকভাবে :
বারবার কেন যে জিততে-জিততে হেরে যাই
প্রভু সব জানে, সব দেখে
চার ছক্কার চক্করে মইহীন পা...
তিন.
রুদ্র সাহাদাৎ সাচ্চা প্রেমিক ও রুদ্রভৈরবী। কবি ও কবিতা তো এই কুঞ্জ ও রুদ্রের অভিঘাতেই বেঁচে থাকে নিরন্তর। তাঁর কাব্য ‘জীবনের জলছবি আকঁছে জেলেমন’ (২০২২) পঞ্চাশটি কবিতার সম্ভারে সাজানো। স্পর্শকাতরতা ও সংবেদনশীলতা নানামুখি বিস্তার নয়ে হাজির হয়েছে এ কাব্যে। সমুদ্র ও সামুদ্রিক জীবনের অনুষঙ্গ বেশ কথা বলে তাঁর এ কাব্যের পংক্তিগুলোতে। রুদ্র নিজেও সাগরপারের জাতক। তাঁর চৈতন্যে এই জলসন্ন্যাসী বড় একটা পরিসর দখল করেছে খুব স্বাভাবিক কারণেই। সমুদ্রটি ‘উপ’ নামধারী হলেও তার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক প্রভাব মোটেই খটো নয় এ অঞ্চল ও দেশজোড়া জনজীবনে। ‘ব্লু’ বা নীল অর্থনীতির আকর হয়ে এই অথই জলরাশি নিত্য দোলাচ্ছে দেশ-বিদেশের সমৃদ্ধি সন্ধানীদের অন্তরদেশ। এই পাথারের বুকে সনাতনী পেশা ও সাহসে ভর করে যাঁরা নিয়ত জীবন সাজাতে ব্যস্ত-সমস্ত, সেই জেলে সম্প্রদায় ও তাঁদের সুখদুঃখের কাহন এই কবিকে নাড়ায়, ভাবায়। রুদ্র সাহাদাৎ নামের এই দরদি পথচারী সে কথা বলছেন :
একটি সুর কানে বাজে জোয়ার-ভাটার ঢেউয়ে-ঢেউয়ে
দিন দুপুর—রাত্রিভোর—জলজ মিউজিক।
ঘুমের ভিতর শুনি—জেগে-জেগে শুনি
জলের ওপর জলের খেলা
জলের ওপর জলের মেলা।
উড়ে যাওয়া একঝাঁক শাদা গাঙচিল বইল্যা গ্যালো :
জাইল্ল্যার পুত, কাজে মন দে...
চার.
এ আহ্বানে মন নিশ্চয়ই সচকিত হয়ে ওঠে। চারদিক থেকে ব্যাপ্ত হয়ে আসে আগামী সম্ভাবনার দূতেরা। এই অর্থনীতি, এই জীবনধারার স্বতন্ত্রতা উচ্চাশায় দ্যোতিত হয়। এ যেন গতানুগতিকতার ফাঁদ ভেঙে নতুন উদ্ভাবন আর নতুন মনন ও প্রযুক্তির প্রত্যাশাকে নির্দেশ করতে চায়। রুদ্র কাব্যচর্চায় নিরন্তর নিবিষ্টতার যে-চাষবাস করে চলেছেন, তার আরেকটি উদযাপন হচ্ছে ‘চেতনায় একাত্তর হৃদয়ে বাংলাদেশ’ (২০২৩)। এখানে নতুন প্রজন্মের চোখে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি রেখাচিত্র পাওয়া যাচ্ছে অনুভূতিদেশের আলো হয়ে। গ্রন্থটি ৫০টি কবিতা—সমবায়ে সজ্জিত। এখানে স্বাধীনতার মানে মুক্তচিন্তা, মুক্তমন এই ধারণাকে ভিত্তি হিশেবে ধারণ করা হয়েছে, যেমন :
চিৎকার দিয়ে এখন গাইতে পারি গান যখন-তখন
মুক্তমনা মুক্তচিন্তা সহস্রকথা কথার পিঠে কথা
চেতনায় একাত্তর হৃদয়ে বাংলাদেশ...
পাঁচ.
রুদ্র সাহাদাৎ কাব্যচর্চায় এক নিরন্তর পরিযায়ী সত্তা। তাঁর নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘লাল জুলাই সাদাকালো যৌবন’ একেবারে সাম্প্রতিক সময়ের চিত্র ও কথকতার বুনন। গত জুলাইয়ের ছাত্র—জনতার অভ্যুত্থানের নানাপর্ব ও দেশব্যাপী তার আলোড়নের ছায়া কবিতাগুলোর অনেকাংশেই জোরালো ছায়া ফেলেছে। যেমন : ‘আয়নাঘর’ ‘আবু সাইদ’ ‘ধোঁয়ায় উড়ে যায় স্বপ্ন’ ‘পানি লাগবে কারো পানি’ এবং নামকবিতা ‘লাল জুলাই সাদাকালো যৌবন’। এছাড়া প্রাত্যহিক নিসর্গমন্থন, নদীময়তা, নস্টালজিয়া, নিরানন্দ সময়ের আনমনা খোলামকুচি খেলা, শৈশবের প্রতি মিষ্টি-মধুর কলতান ও বিহ্বলতার একধরনের গোপন টান ইত্যাদির চলনে তার কবিতা জীবনের কথাগুলোকে গুছিয়ে আনে। রুদ্র সাহাদাৎ প্রান্তরের কবি। খোলা জীবন ও তার যাপনের নান্দিকার।
একটি একান্ত নমনীয় ভাষার ধমনি বেয়ে তার কবিতাগুলো প্রাণভরা কথা বলতে চায় সকলের সঙ্গে। সুন্দর ও সার্বিকতার প্রতি এই কবির রয়েছে অনন্ত প্রীতি ও জিজ্ঞাসু ভালোবাসা।
ছয়.
রুদ্র সাহাদাৎ কবিতাপাড়ায় পরিচিতস্বর, পরিচিত মুখ। বাস্তবাদী কবি-চোখে দেখা বাস্তবতায় বিশ্বাসী। তাঁর নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘স্বপ্নে ঝুলে থাকে স্বপ্ন’ প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম সাম্প্রতিক সময়ের চিত্র দেখা যায়। ফিলিস্তিনের মতো বিধ্বস্ত যৌবন—এই চিৎকার পাঠক শুনতে পাবেন কবিতা পাঠে। প্রতিদিন টেলিভিশন, দৈনিক খবরের কাগজজুড়ে আমরা যা দেখি কিংবা শুনি তার প্রতিছবি রুদ্র সাহাদাৎ এর লেখায় ফুটে ওঠেছে।
স্বপ্নে ঝুলে থাকে স্বপ্ন
ইচ্ছেরা খুন হয় প্রতিদিন
ঈর্ষার রাজ্যে ঘুরেফিরে বেঁচে থাকি
ঘুমে ঝুলে থাকে ঘুম
নির্ঘুম রাত্রির আঁধার, ডানবাম দৌড়ায় চোখ
ফিলিস্তিন গাজা জ্বলে শিশুরা উড়ে যায়—হয়ে যিশু
উড়ে যায় পাগলামন—দিকহারা বিভ্রান্ত পথিক...
ওসমান হাদি কবিতায়—শুনি
যুগে যুগে দেশে দেশে কোনো বিপ্লবীর মৃত্যু নেই -প্রস্তান মানেই মৃত্যু নয়...
সহজ ভাষায় তাঁর কবিতাগুলো প্রাণভরা কথা বলতে চায়, মুক্ত জীবনের খুঁেজ
সারাক্ষণ কবিমন।
হাফিজ রশিদ খান
কবি ও প্রাবন্ধিক
চট্টগ্রাম।