যুগে যুগে মহান আল্লাহ ইসলামের আলোকে সমুন্নত রাখার জন্য কিছু নির্বাচিত ব্যক্তিকে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেন। এরা সমাজ ও রাষ্ট্রের রাহবার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। যখন তাঁদের জীবনী নিয়ে আলোচনা বা লিখিত রূপে তুলে ধরা হয়, তখন এর লক্ষ্য কেবল ব্যক্তি আলোচনায় থাকে না। বরং মূল উদ্দেশ্য থাকে—তাঁদের জীবনের ইতিবাচক দিকগুলো সামনে এনে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ইসলামের অগ্রযাত্রায় তাদেরকে সামনে রাখা। এটি দাওয়াতের এক গুরুত্বপূর্ণ পন্থা।
শায়খ ইমদাদুল হক লিখিত 'মাওলানা আরশাদুল আলম (রাহ.)' গ্রন্থটি একজন প্রাজ্ঞ আলেম ও নিভৃতচারী সাধকের জীবন ও কর্মভিত্তিক প্রামাণ্য রচনার অনন্য উদাহরণ। বিগত শতাব্দীর এক কর্মবীর ও প্রাজ্ঞ আলেম হিসেবে মাওলানা আরশাদুল আলম (রাহ.)। আমৃত্যু মানুষকে হিদায়াতের পথে ডাকতে তিনি একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তিনি নিজের প্রতিভা, মেধা ও সক্ষমতার কুরবানি দিয়ে একেবারে অজপাড়াগাঁয়ে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
সব মহৎ কাজেরই থাকে প্রাথমিক ভিত্তি। বইটি পাঠ করে মনে হয়েছে, চুয়াডাঙ্গা এলাকায় ইসলামের প্রচার-প্রসারে মাওলানার কর্মযজ্ঞ একরকম ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে কাজ করেছে। হয়তো আজ আমরা যে আলোর দিশা পেয়েছি, তা সেই পরিশ্রমেরই সুফল।
মাওলানা ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী। যাদের সঙ্গে তার মতপার্থক্য ছিল, তারাও তাকে শ্রদ্ধাভরে 'আমার মাওলানা' বলে সম্বোধন করতেন। তিনি ছিলেন বাগ্মী, সমাজসচেতন ও আত্মসচেতন এক আলোকবর্তিকা। মাওলানার মতাদর্শ, দ্বীনি পরিশ্রম এবং দাওয়াতি চেতনা—সবই সুন্দরভাবে পরিপূর্ণতায় এসেছে বইটিতে।
লেখক গ্রন্থে মাওলানাকে 'সংস্কারক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শুরুতে এটি কিছুটা বিস্ময়কর মনে হলেও বইটির সমাপ্তিতে এসে সে বিস্ময় কেটে যায়। বরং বলা চলে, লেখক এখানে একটুও অত্যুক্তি করেননি—তিনি তার বিশ্লেষণে যথার্থতা ও সংযম বজায় রেখেছেন।
লেখকের ভাষা নির্মল, হৃদয়গ্রাহী এবং আবেগময়—কিন্তু তথ্যপূর্ণ। লেখায় কোনো কৃত্রিমতা নেই। ভাষা সরল হলেও গভীর। এই গ্রন্থের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক দিক হচ্ছে এর বর্ণনাভঙ্গির স্বচ্ছতা ও অন্তরঙ্গতা। এতে নেই কোনো নাটকীয় উত্থান-পতন, বরং আছে এক সুনিয়ন্ত্রিত আবেগ। বইটিতে নানা ঘটনা, শেষাংশের হস্তলিপি, তার স্মৃতি বিজড়িত কিছু জায়গা তুলে ধরা হয়েছে যা একটি আলেমের জীবনীকে শুধুমাত্র আধ্যাত্মিক নয়, বাস্তবিক দিক থেকেও জোরালো করে তোলে।
বইটা পড়ে মনে হয়েছে, আমরা যেসব ত্যাগী আলেমদের হারিয়েছি, তারা আসলে হারিয়ে যান না। তারা রয়ে যান শব্দে, চিন্তায়, আর আদর্শে। আর এই বই সেই থাকার সাক্ষ্য দেয়—নীরব, অথচ দৃঢ়ভাবে।
শায়খ ইমদাদুল হক (আলিম, উস্তায, ইমাম, খতীব ও লেখক) তিনি জন্মেছেন আপন মাতুলালয় চুয়াডাঙ্গা সদরের কুতুবপুর গ্রামে— ১৯৮২ সালের ২৫ ডিসেম্বর শনিবার ভোর-সকালে। আলমডাঙ্গা উপজেলার নওলামারি গ্রামে তার পৈতৃক নিবাস। ২০০৪ সালে জামিআ আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম, ফরিদাবাদ, ঢাকা থেকে দাওরা হাদীস শেষ করে কিছুদিন ইফতা পড়েছেন। বর্তমানে তিনি আলমডাঙ্গা শহরে শিক্ষকতা, ইমামত ও খেতাবতের দায়িত্ব পালন করছেন। উলূমে শারয়িয়্যাহর মতো ঢাকা-কেন্দ্রিক বাংলা সাহিত্যেরও একনিষ্ঠ পাঠক তিনি। সাহিত্য পাঠের পাশাপাশি একসময় প্রচুর ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প ও বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রপত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়েছে। রচনা, সম্পাদনা, অনুবাদ ও সংকলন মিলে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৩টি। ১. তার রচিত গ্রন্থ সমূহ: কুরআন স্পর্শ করতে কি ওযু আবশ্যক নয় (উমেদ প্রকাশ ২০২১), সালাত : আল্লাহর সাথে বান্দার মুনাজাত (উমেদ প্রকাশ ২০২১), সন্তানের অধিকার (সন্দীপন প্রকাশন লিমিটেড ২০২২); ২. অনূদিত গ্রন্থ: কিয়ামুল লাইল ও তারাবীহ সালাতের রাকআত সংখ্যা : একটি হাদীসতাত্ত্বিক পর্যালোচনা (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০১৯); ৩. সংকলিত গ্রন্থ: ছোটদের শতআয়াত শতহাদীস (আবর্তন ২০১৯); ৪. সম্পাদিত গ্রন্থ সমূহ: হজ্জের আধ্যাত্মিক শিক্ষা (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০১৭), জিজ্ঞাসা ও জবাব ১-৫ খণ্ড (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০১৭-২০২০), ফিকহুস সুনানি ওয়াল আসার ১-৩ খণ্ড (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০১৯), ইযহারুল হক ১-৩ খণ্ড (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০২০), দৈনন্দিন মাসনূন দুআ ও যিকর (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০২০), যুগের মহান দাঈ ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০২০), প্র্যাকটিসিং মুসলিম (মুভমেন্ট পাবলিকেশন্স ২০২১), মিম্বারের আহ্বান-১: সমাজ সংস্কারের দিক নির্দেশনা (আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স ২০২২)।