পৃথিবীর সকল সমাজব্যবস্থাকে একটি নিয়মতান্ত্রিক সূত্রে আবদ্ধ করে রেখেছে যে অদৃশ্য নিয়ামক তার নাম হল আইন। আইন ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, দেখা যায় না, কিন্তু কোনো সমাজে আইনের অস্তিত্ব থাকলে তা অনুভব করা যায়। আইন আছে বলে আমরা মানুষ এই পৃথিবীতে অনেকগুলো কল্যাণকর রাষ্ট্র পেয়েছি, আইন আছে বলে আমাদের সমাজ একটি নিয়মের মধ্য দিয়ে চলে, আইন আছে বলে আমরা অন্যায়-অবিচার থেকে বিরত থাকি। অন্যথায়- আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ত, সমাজব্যবস্থা তার নিজস্ব নিয়মে চলত না, অবিচার-অনাচারের অন্ধকারে ডুবে নরকে পরিণত হত আমাদের এই সুন্দর পৃথিবী। একদিনের জন্যেও কি আমরা আইনবিহীন সমাজ কল্পনা করতে পারি? মোটেই পারি না। এটি আমাদের কল্পনার অতীত, আমাদের চিন্তার বহু বাইরে। মাত্র একদিনের জন্যেও যদি আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে আইনের কার্যকারিতা উঠিয়ে নেওয়া হয়, মাত্র দশ ঘন্টার জন্যেও যদি আমাদের সমাজব্যবস্থায় আইনের বিদ্যমানতা না থাকে, ফলাফল হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক। চব্বিশ ঘন্টায় আমাদের রাষ্ট্র আর রাষ্ট্রের অবস্থানে থাকবে না, সমাজ আর সমাজের অবয়বে থাকবে না। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা-অর্থব্যবস্থা-সমাজব্যবস্থাসহ সকল ব্যবস্থা পুরোপুরিভাবে, সামগ্রিকভাবে অচল হয়ে পড়বে। চব্বিশ ঘন্টায় কয়েক কোটি অপরাধ সংগঠিত হবে, মানুষ অন্যের সম্পত্তি দখল করা শুরু করবে, এক রাষ্ট্র আরেক রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে বসবে। চব্বিশ ঘন্টায় বাণিজ্য ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হবে, হত্যা-ধর্ষণ-হানাহানি-মারামারি-প্রত্যারণার অভয়ারণ্যে পরিণত হবে আমাদের এই নিখিল বসুন্ধরা। কেউ কারও কথা শুনবে না, কেউ কোনো বিধান মানবে না, কারও জন্য কোনো নিয়ম থাকবে না; এককথায়Ñ আমাদের সুন্দর পৃথিবী হবে অপরাধের অভয়াশ্রম।
মানুষের প্রয়োজনে, সমাজব্যবস্থার প্রয়োজনে আইনের জন্ম হয়েছে। আইন সমাজের কথা বলে, রাষ্ট্রের কথা বলে, মানুষের অধিকারের কথা বলে। আইন ব্যতীত সমাজ অচল, রাষ্ট্র অচল, এই পৃথিবী অচল। অথচ যে আইন আমাদের জন্য এত কিছু করে যাচ্ছে, সমাজকে একটি নিয়মের মধ্যে চালাচ্ছে, রাষ্ট্রকাঠামো সৃষ্টি করেছে, সে আইনেরও যে জীবন ও দর্শন রয়েছে তা আমরা অনেকেক্ষেত্রেই উপলব্দি করি নাই, কিংবা করতে পারি নাই। আমরা কি কখনো ভেবেছি- মানুষের মতোই আইনেরও রয়েছে জন্ম-মৃত্যু, আইনের জীবনেও হয় বিবর্তন, আইনেরও রয়েছে পৃথক একটি জীবনচক্র? আমরা কি কখনো চিন্তা করেছি- আইনের শক্তি কতখানি, আইনের অন্তর্নিহিত দর্শন কী, কিংবা আইনের গতি ও প্রবাহ কীভাবে চলে? সত্যি বলতে আমরা সেভাবে চিন্তা করিনি, সেভাবে অনুধাবন করিনি যে আইনের জীবন ও দর্শন নিয়ে আমাদের কিছু ভাবার রয়েছে, সেভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারিনি যে আইনের অন্তর্নিহিত দর্শন কী, বা এর তাৎপর্য কী। আমরা আইনের শাসনের কথা শুনেছি, আইন ও বিচার নিয়ে ভেবেছি, আইনবিজ্ঞান নিয়ে লিখেছি, আইন গবেষণায় ডুব দিয়েছি, কিন্তু এর জীবন ও দর্শন নিয়ে সেভাবে ভাবতে পারিনি। সত্যি বলতে আমাদের প্রয়োজনে আমরা সমাজে আইনের শাসনের কথা বলি, আমাদের প্রয়োজনে আমরা নিত্যদিন আইনের চর্চা করে থাকি, কিন্তু আইনের দর্শন নিয়ে চিন্তা করি না, আইনের শক্তি, আইনের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়ে আলাদা করে ভাবি না।
এই যে আইনের জীবন ও দর্শনের কথা বলছি তা কিন্তু আমরা যারা আইনের শিক্ষার্থী রয়েছি তাদের আলাদা করে ভাবতে হবে, বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে। আমাদের জানতে হবে- আইনের বিবর্তন কীভাবে হয়, আইনের অন্তর্নিহিত দর্শন কী, আইন কী বলতে চায়, আইনের গতি ও প্রবাহ কীভাবে এগিয়ে চলে, আইনবিজ্ঞান কাকে বলে, আইন ও বিচারের মধ্যে সম্পর্ক কী, আইনের বিকাশ কীভাবে ঘটে। আমাদের জানতে হবে আরও বহু কিছু।
যাইহোক, শুধুমাত্র আইনের কোমলমতী শিক্ষার্থীদের অনুপ্রেরণা যোগানোর উদ্দেশ্যে, উৎসাহিত করার অভিপ্রায়ে ছোট্ট এই পুস্তকটি রচিত হয়েছে। ফলে পুস্তকটিতে ব্যবহৃত হয়েছে আইনের কঠিন অভিব্যক্তির পরিবর্তে সাহিত্যের কোমল ও প্রাঞ্জল ভাষা। সরাসরি বিশ^বিদ্যালয় পড়–য়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে পুস্তকটি লিখেছি বিধায়, পুস্তকটিতে ‘আপনি’ কিংবা ‘আপনার’ স্থলে সর্বদা ‘তুমি’, ‘তোমরা’ কিংবা ‘তোমাদের’ শব্দসমূহ ব্যবহৃত হয়েছে। এছাড়াও পুস্তকটি যাতে শাশ^ত সবুজ থাকে তার জন্য এর বিভিন্ন স্থানে ‘কয়েক দশক পরে’, ‘কয়েক যুগ পরে’, কিংবা ‘আরও শত বৎসর পরে’ অভিব্যক্তিগুলোকে স্থান দেওয়া হয়েছে।