বিশ্বব্যাপী এবং বাংলাদেশে জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ নিম্ন আয়ের বা দরিদ্র হলেও প্রচলিত বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা অনেক সময় এই শ্রেণিকে এড়িয়ে চলে। নিম্ন আয়ের মানুষরা কেবল দরিদ্রই নয় বরং তারা একটি শক্তিশালী ‘ভোক্তা শ্রেণি’। একে ‘পিরামিডের তলদেশ’ বা ‘bottom of the pyramid’ (BoP) বলা হয়। এই জনগোষ্ঠীর সংখ্যা অনেক বেশি, যা সম্মিলিতভাবে একটি বিশাল বাজারের সমান। তারা অত্যন্ত সচেতনভাবে অর্থ ব্যয় করে এবং পণ্যের কার্যকারিতার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। বড় প্যাকেটের চেয়ে ছোট বা কম দামের ‘মিনি প্যাক’ বা ‘শ্যাসে’ তাদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য। জাঁকজমকপূর্ণ বিজ্ঞাপনের চেয়ে পণ্যের স্থায়িত্ব এবং উপযোগিতার ওপর তারা বেশি গুরুত্ব দেয়। পাড়ার মোড়ের ছোট দোকান, মুদি দোকান, হকার বা ফুটপাতের দোকান থেকে তারা বেশিরভাগ পণ্য কেনে। বিক্রেতার দিক থেকে ‘অল্প লাভে বেশি বিক্রি কৌশল’ এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর।
এই বাজারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে- আয়ের অনিশ্চয়তার কারণে পণ্য ক্রয়ে ধারাবাহিকতার অভাব, দুর্গম এলাকায় পণ্য পৌঁছানোর উচ্চ খরচ ও জটিলতা, প্রচলিত যোগাযোগ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা, স্থানীয় ও ‘লোকজ’ প্রচারণার প্রয়োজনীয়তা। এই বাজারে পণ্য ও সেবা বিক্রয়কারী কোম্পানিগুলোকে নৈতিক ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ হতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষকে নিম্নমানের পণ্য গছিয়ে দেয়া উচিত নয়। সাশ্রয়ী মূল্যে পুষ্টিকর ও মানসম্মত পণ্য নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়ের পাশাপাশি তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা কোম্পানিগুলোর সামাজিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে বাজারজাতকরণ কেবল ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য নয়, এটি একটি সামাজিক উদ্ভাবন। সঠিক কৌশলের মাধ্যমে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করেই কেবল টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
এই বইটিতে ‘বিওপি’ মার্কেটিংয়ের তাত্ত্বিক ভিত্তি, নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের ক্রয় আচরণ, বাজারজাতকরণ মিশ্রণ কৌশল : ৫-‘এ’, গ্রামীণ বাজারজাতকরণ, অর্থনৈতিক সংকটকালে বাজারজাতকরণ কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। দরিদ্র মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ‘মিনি প্যাকের’ সুবিধা, অসুবিধা ও চ্যালেঞ্জগুলো আলোচনায় এসেছে। দরিদ্র মানুষেরও প্রত্যাশা বাজারজাতকরণ কোম্পানিগুলো তাদের প্রতি নৈতিক ও যৌক্তিক আচরণ প্রদর্শন করবে, এই বিষয়ে একটি অধ্যায়ে পৃথক আলোচনা করা হয়েছে। যেসব পাঠক বাজারজাতকরণ বিষয়টিকে পাঠ্য হিসেবে অধ্যয়ন করেননি বা অনেক আগে অধ্যয়ন করেছেন, তাদের অনুধাবনের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় পূর্বজ্ঞান হিসেবে এই বইটির শেষে ‘বাজারজাতকরণ মতবাদ’ এবং ‘টার্গেট মার্কেটিং’ শীর্ষক দুটি অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই বইটি পড়ার আগে পূর্বজ্ঞান অর্জনের জন্য শেষ দুটি অধ্যায় পড়ে নিলে এই বইয়ের অনেক ধারণা সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান নিয়েই বইটি পড়া শুরু করা যাবে।