শিশু-কিশোর সাহিত্যের প্রকৃত শক্তি নিহিত থাকে তার সরলতায়, মানবিকতায় এবং পাঠকের হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষমতায়। সুফিয়ান আহমদ চৌধুরীর “চাঁদের হাটের মেলা” গ্রন্থটি সেই শক্তিরই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এটি কেবল গল্পের সংকলন নয়; বরং আমাদের সমাজ, ইতিহাস, পারিবারিক সম্পর্ক, দেশপ্রেম ও স্বপ্নময় শৈশবকে এক সুতোয় গাঁথা এক আবেগঘন সাহিত্যিক দলিল।
এই গ্রন্থের গল্পগুলোতে লেখক শিশু-কিশোরদের পরিচিত জগতকেই কেন্দ্র করে এগিয়েছেন। স্কুল, পরিবার, বাবা-মা, দাদা-দাদি, বইমেলা, গ্রাম-শহরের জীবন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস— সবকিছুই এসেছে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও হৃদয়স্পর্শী ভঙ্গিতে। “বৃষ্টির দিনে সুমা”, “বাবার ছায়া”, “লাল ফিতে”, “বিজয়ের মিছিল”-এর মতো গল্পগুলোতে আমরা দেখি কখনও শিল্পীসত্তার বিকাশ, কখনও পিতা-কন্যার অটুট ভালোবাসা, কখনও শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, আবার কখনও মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি।
গ্রন্থটির অন্যতম বড় শক্তি হলো এর মানবিক আবেদন। “বাবার ছায়া” গল্পে পিতা হারানোর শূন্যতা যেমন নিঃশব্দে হৃদয় ছুঁয়ে যায়, তেমনি “লাল ফিতে” গল্পে দরিদ্র পরিবারের শিশুর স্বপ্ন ও রঙিন কল্পনা পাঠককে আশাবাদী করে তোলে। লেখক কোথাও অতিরিক্ত উপদেশ দেন নাই; বরং গল্পের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়েই মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক শিক্ষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
ভাষার দিক থেকেও “চাঁদের হাটের মেলা” সাবলীল ও প্রাণবন্ত। সহজ বাক্য, পরিচ্ছন্ন শব্দচয়ন এবং সংলাপের স্বাভাবিকতা শিশু-কিশোর পাঠকদের জন্য পাঠকে আনন্দদায়ক করে তোলে। একই সঙ্গে বড়দের কাছেও গল্পগুলো অর্থবহ হয়ে ওঠে। কারণ, এখানে রয়েছে স্মৃতি, অনুভব এবং ইতিহাসের গভীর ছায়া। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্পগুলোতে লেখক অত্যন্ত দায়িত্বশীলভাবে ইতিহাস ও আবেগের সমন্বয় ঘটিয়েছেন।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো— এই বইয়ের গল্পগুলো কল্পনাপ্রসূত হলেও বাস্তব-জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ফলে পাঠক নিজেকে গল্পের চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে পারে, তাদের আনন্দ-বেদনা অনুভব করতে পারে। এটাই একজন দক্ষ কথাশিল্পীর সবচেয়ে বড় সাফল্য।
সব মিলিয়ে বলা যায়, “চাঁদের হাটের মেলা” শিশু-কিশোর সাহিত্যে একটি পরিপূর্ণ ও মূল্যবান সংযোজন। এই গ্রন্থ শুধু বিনোদন দেবে না; বরং পাঠকের মননে বপন করবে মানবিকতা, দেশপ্রেম ও স্বপ্ন দেখার সাহস।
আমি বিশ্বাস করি, এই বইটি শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকরাও আগ্রহ নিয়ে পড়বেন এবং উপভোগ করবেন। সবশেষে, বইটির ব্যাপক প্রচার-প্রসার কামনা করছি।
— মোহাম্মদ অংকন
লেখক