সাহিত্য মূলত মানুষের ভেতরের কথা বলার এক অনন্ত প্রয়াস। কখনো তা আনন্দে উচ্ছ্বসিত, কখনো প্রকৃতির রূপে মোহময়, আবার কখনো নিঃশব্দ একাকীত্বে ভেজা দীর্ঘশ্বাস। এই কাব্যগ্রন্থ জুড়ে কবি সেই অন্তর্লোকের কথাই উচ্চারণ করেছেন- যেখানে মানুষ, সময়, সমাজ, প্রেম, প্রকৃতি ও আত্মজিজ্ঞাসা একে অপরের সঙ্গে মিশে এক গভীর মানবিক ভাষা নির্মাণ করেছে।
এই গ্রন্থের কবিতাগুলোয় প্রকৃতি কেবল দৃশ্য নয়, অনুভব। বৈশাখ, ফাগুন, শরৎ, হেমন্ত, সর্ষে ফুলের মাঠ, কামিনী ফুলের সুবাস, এক মুঠো আকাশ- সবই কবির অনুভূতির বাহন হয়ে উঠেছে। প্রেম এই গ্রন্থের একটি প্রধান প্রবাহ, কিন্তু তা কেবল রোমান্টিক আবেশ নয়। এই প্রেম অপেক্ষার, বিরহের, নিষেধের, স্মৃতির ও আসক্তির। ‘অপেক্ষা’, ‘ভোলা তো গেলো না’, ‘চাইতাম তোমায় বারে বার’, ‘চির আসক্তি’, ‘তোমায় ভেবে’ কিংবা ‘খুঁজো না ভালোবাসা’- এই কবিতাগুলোতে প্রেম একদিকে আশ্রয়, অন্যদিকে যন্ত্রণার নাম। কবি প্রেমকে দেখেছেন মানব অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে- যেখানে সুখ ও বেদনা একই মুদ্রার দুই পিঠ।
এই গ্রন্থে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মানুষের একাকীত্ব। ‘মানুষ বড়ো একা’, ‘একাকীত্ব’, ‘একান্ত অনুভব’, ‘আজকাল আমি’- এই কবিতাগুলো আধুনিক মানুষের মানসিক বাস্তবতা প্রকাশ পেয়েছে।
‘হতে চাই সাধারণ’ কবিতায় অহংকার ও ভণ্ড গৌরবের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অবস্থানকে যে দৃঢ়তায় তুলে ধরা হয়েছে, তা এই গ্রন্থের নৈতিক মেরুদণ্ড।
মায়ের স্মৃতি, নারীর শক্তি, মমতা ও সংগ্রাম- এসব কবিতায় আবেগ কখনো সংযত, কখনো প্রবল, কিন্তু সর্বদা আন্তরিক। নারী এখানে কেবল সৌন্দর্যের প্রতীক নয়- সে শক্তি, সহনশীলতা ও সভ্যতার ধারক।
এই গ্রন্থের কবিতাগুলো ভাষায় সহজ, কিন্তু ভাবনায় গভীর। কোথাও সরল ছন্দ, কোথাও গদ্যছন্দে ভাবের বিস্তার- সব মিলিয়ে কবি পাঠকের সঙ্গে এক নীরব সংলাপ গড়ে তুলেছেন। এখানে কবি উপদেশ দেন না, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না; বরং পাঠককে ভাবতে দেন, অনুভব করতে দেন, নিজের জীবনের সঙ্গে কবিতার মিল খুঁজে নিতে দেন।
বলা যায়, এই গ্রন্থের কবিতাসমূহ একত্রে একটি জীবনের মানচিত্র। যেখানে আনন্দ আছে, ক্ষয় আছে, প্রেম আছে, প্রতিবাদ আছে, স্মৃতি আছে, আর আছে গভীর এক মানবিক আকুতি। এই কাব্যগ্রন্থ পাঠককে শুধু পাঠের আনন্দই দেবে না, বরং নিজের ভেতরের মানুষটির মুখোমুখি দাঁড় করাবে।