২০০২ সালে হাঙ্গেরি থেকে সাহিত্যে প্রথম নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখক ইমরে কারতেস তাঁর 'কাদ্দিশ ফর এ চাইল্ড নট বর্ন' (অনাগত শিশুর জন্য শোকগাথা) উপন্যাসে লিখেছেন-আমি আনন্দ পাওয়ার জন্য লিখি না, বরং লেখার মাঝে আমি বেদনা খুঁজে ফিরি-যত তীব্র, তত বেশি ভালো, সবচেয়ে ভালো-যদি তা একেবারে সহ্যসীমার বাইরেও হয়, তবুও। হাঙ্গেরীয় লেখক কারতেস দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিটলারের ভয়ংকর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প 'অসভিৎস' বন্দিশিবির থেকে যে ক'জন মানুষ জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পেরেছিল তাঁদের একজন। 'অসভিৎস' এর বীভৎসতা সম্পর্কে লেখক নিজেই বলেছিলেন অসভিৎসের কোনো ব্যাখ্যা হয় না। ২০২০ থেকে ২০২৩-এই অবিহিতকালে বাদুড় থেকে ছড়িয়ে পড়া 'করোনা' নামের সূক্ষ্ম ভাইরাসটি বিশ্বজুড়ে যে সর্বপ্লাবী তাণ্ডব চালিয়ে গেল লক্ষ লক্ষ প্রাণ সংহার করে, এর কি কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা হয়? জীবনের সাথে 'করোনা' নামের শব্দটির যেন কোনো সম্পর্ক ছিল না, যতটা ছিল মৃত্যুর সাথে। দুনিয়াজুড়ে শুরু হয়েছিল জ্বরাতঙ্ক। শরীরের তাপমাত্রা একশ পেরুলেই মানুষ তার চোখের সামনে মৃত্যুর প্রলয় নাচন প্রত্যক্ষ করত।
আধুনিক সভ্যতা গড়ার নামে মানুষ ধ্বংস করে দিয়েছে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র। অপরিকল্পিত নগরায়ণ করে বৈশ্বিক পরিবেশগত ভারসাম্য আর সুস্থিতির যে অপরিমেয় ক্ষতি করেছে আধুনিক মানুষ, তার শাস্তি হিসেবে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিয়েছে বারবার। নিসর্গের প্রতিহিংসা যে অমোঘ অব্যর্থ হয়ে এই ধরায় নেমে আসবে তার আভাস রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রেখে গেছেন তাঁর লেখা নাটক 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' (১৮৮৪) আর তাঁর 'চৈতালি' কাব্যের (১৮৯৬) 'সভ্যতার প্রতি' কবিতায়। 'প্রকৃতির প্রতিশোধ' রচনার প্রথম দৃশ্যে তিনি লিখেছেন-বাদুড় গুহায় পশি সুদূর হইতে/অমানিশীথের বার্তা আনিছে বহিয়া। কিংবা 'চৈতালি'তে কবির আকুতি 'দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর/লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাঠ ও প্রস্তর/হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী/দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি।' রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রকৃতির প্রতিশোধের ধারণা যেন অভ্রান্ত হয়ে পর পর তিনটি বছর চতুর্দিক থেকে ঘিরে ধরেছিল এই অবনিতলকে।
করোনা ক্রান্তিকালে সমাজ থেকে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো হয়ে গিয়েছিল নির্বাসিত, এমনকি মন্দির, মসজিদ, চার্চ, সিনাগগ কিংবা প্যাগোডাগুলোর কাজও হয়ে পড়েছিল সংকুচিত। করোনা সময়ে একমাত্র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ছাড়া উপাসনালয়গুলোর বাস্তবিক অর্থে কোনো কাজই ছিল না, এই ক্ষুদ্র ভাইরাস বিশ্বলোকে ঈশ্বরের অস্তিত্ব আর অনস্তিত্ব সম্পর্কে মানবকুলকে সংশয়ী করে তুলেছিল। সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারজয়ী ফরাসি লেখক আলবেয়ার কামুর সেরা সৃষ্টি 'দ্য প্লেগ' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। একসময় মানুষের আনন্দমুখর যাপিত জীবনের ওপর অভিশাপের মতো নেমে এসেছিল ইঁদুরবাহিত প্লেগ জীবাণু। আলবেয়ার কামুর রচনাটির বিশাল অংশ জুড়ে আছে 'অ্যাবসার্ডিটি' আর 'মেটাফর'এর যুগলবন্দি কিন্তু 'করোনা দহনকাল' শিরোনামের ট্রিলজিতে কোনো অপ্রামাণ্য কিংবা রূপক বিষয়ের অবতারণা করা হয়নি, এই রচনার পাতায় পাতায় যা আছে তা শুধুই 'রিয়্যালিটি'। যা বাস্তব, যা সত্য সেই সব প্রকৃত সত্তা লেখক যেন আত্মকথনের ভঙ্গিতে তুলে এনেছেন এই বিশাল ট্রিলজির ক্যানভাসে।
বরেন চক্রবর্তী গল্প লেখেন না, গল্প আঁকেন। তাঁর কলমের ডগায় জীবনের ইতিহাস মূর্ত হয়ে ওঠে প্রতিটি সৃষ্টিকর্মের পাতায় পাতায় ঠিক ছায়াছবির মতো। ঘড়ি মানুষকে বর্তমান সময়টা বলে দেয় কিন্তু ঘড়ি সময় ধরে রাখতে পারে না। এটি তার সীমাবদ্ধতা। কিন্তু লেখকের কলম সময় ধরে রাখে অনাগত কালের পাঠকের মনে বর্তমানকে প্রবহমান করে রাখার প্রয়াসে। লেখক সময় ধরে রাখেন ঠিক যেমন করে চিত্রকর ক্যানভাসে ধরে রাখেন আলো-ছায়াকে অনন্তকালের জন্য। এই ট্রিলজিতে লেখক শুধুই সময়কে ছাপার অক্ষরে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। মানুষের জীবন, মৃত্যু, ভালোবাসা, বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, বিশ্বাসের অযথার্থতা, ঈশ্বরতত্ত্বের অসারতা আর মানবিক মূল্যবোধের সীমানা ছুঁয়ে যাওয়া এক আলেখ্য আর যুগের দলিল এই করোনা ট্রিলজি। 'করোনা দহনকাল' শুধু সময়ের ছাপচিত্র নয়, এটি অদ্যাবধি বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘতম আর গহন গভীর অনুভবের অলোকসামান্য মৌল উপন্যাস। করোনাদগ্ধ সময়ের অনন্যগতিক টলটলায়মান পৃথিবীর বহুস্তরী অস্থির বাস্তবতা আর একটি সূক্ষ্ম ভাইরাসের ভুবনবিস্তারী সর্বনাশা বিনাশলীলার আদ্যন্ত নন্দিত শিল্পে উত্তরিত হয়েছে এই ট্রিলজিতে। নোবেল লরিয়েট ইমরে কারতেসের মতো এই লেখায় সুন্দরকে খোঁজা হয়নি, লেখক অবিশ্রান্তভাবে খুঁজে বেড়িয়েছেন দগ্ধা সময়ের দুর্বিষহ জীবনের বেদনার কথা।